
‘জয়গুরু' বা 'গুরুর জয়' একই কথা। ইহার মূল অর্থ হইল গুরুর জয় হউক। পূর্বে প্রজাগণ রাজার নামে জয়ধ্বনি দিতেন। রাজার জয় হউক। 'রাজার জয় হউক অর্থই হইল (১) রাজার শত্রু বিনাশ হউক, (২) রাজার রাজ্য পরিসর বৃদ্ধি হউক, (৩) রাজার প্রজাগণ ও রাজকর্মচারিগণ সুখে থাকুন, (৪) রাজ্যে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অনাবৃষ্টি আদি না হউক, (৫) রাজ্যে সর্বত্র শান্তি বিরাজমান থাকুক, (৬) প্রজাগণ ধর্মপরায়ণ হউন, (৭) স্বয়ং রাজা সুখে, শান্তিতে ও আনন্দে থাকুন ইত্যাদি। রাজার নামে জয় দেওয়ার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এতোগুলি। এই সমস্ত উদ্দেশ্যের প্রতিনিধিই হইল রাজার নামে জয় দেওয়া। তেমনি গুরুর নামে জয় দেওয়া বা 'জয়গুরু' বলিবার অন্তনির্হিত উদ্দেশ্যও অনেক। জয়গুরুর উদ্দেশ্য হইল—গুরুর ইচ্ছা পূর্ণ হউক্ । এখন গুরুর ইচ্ছা কি কি বিশ্লেষণ করিয়া দেখিতে হইবে। গুরুর ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য হইল— (১) শিষ্যভক্তগণের ধর্মচেতনা সংজাত হউক, (২) তাঁহারা যেন ধর্মপথে থাকেন, (৩) তাঁহারা যেন গুরূপদিষ্ট পথে সাধন-ভজন করেন, (৪) তাঁহাদের সংসারাসক্তি ক্রমশঃ বিনষ্ট হয় ও মোক্ষাসক্তি জন্মায়, (৫) তাঁহারা যেন শ্রীগুরুর চরণাশ্রিত হইয়া ঐহিক জীবনে সুখ ও পারত্রিক জীবনে সুখ-শান্তি-আনন্দ লাভ করিতে পারে, (৬) তাঁহাদের মধ্যে যাহাতে তত্ত্বজ্ঞান ফুটিয়া ওঠে, (৭) সমগ্র বিশ্বে সকল প্রাণীর যাহাতে মঙ্গল হয়। শ্রীগুরুর এই ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য।
নির্গুণ ব্রহ্মই শুরু। সৃষ্টিতে আদিগুরু স্বয়ং নারায়ণ। ব্রহ্মবিদ্যাসম্প্রদায়ের আদিগুরু নারায়ণ। নারায়ণের পর ব্রহ্মা, বশিষ্ঠ, শক্তি, পরাশর, ব্যাসদেব, শুকদেব, গৌড়পাদ, গোবিন্দপাদ, শঙ্করাচার্য, পদ্মপাদ, হস্তামলকাচার্য, সুরেশ্বরাচার্য, তোটকাচার্য ইত্যাদি। সেই পরম্পরায় স্বামী সচ্চিদানন্দ, নিগমানন্দ ইত্যাদি। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের গুরু রহিয়াছেন। গুরুর মধ্যে যে 'গুরুশক্তি' রহিয়াছে তাহাই ব্রহ্মশক্তি। সেই শক্তির বিকাশ গুরুর মধ্যে। গুরু ও ব্রহ্ম এক এবং অভিন্ন। তাই গুরুর নিন্দা করিলে ব্রহ্মেরই নিন্দা করা হয় আবার গুরুর জয় দিলে ব্রহ্মেরই জয় দেওয়া হয়। সেই কারণে সকল গুরুভক্ত গুরুর নামে জয় দিবেন বা ‘জয়গুরু' বলিবেন। গুরুর নামে জয় দিলে ব্রহ্মেরই জয় দেওয়া হইল। সমস্ত সম্প্রদায়ে গুরু রহিয়াছেন। তাই ‘জয়গুরু' একটি অসাম্প্রদায়িক নাম। যদিও শ্রীশ্রীঠাকুর নিগমানন্দ পরমহংসদেব এই ‘জয়গুরু' মহানামের প্রবর্তক তবুও বহু সম্প্রদায় এই 'জয়গুরু' নাম উচ্চারণ করেন। জয়গুরু নামের মধ্যেই ব্রহ্মশক্তি। তাই জয়গুরু নাম করিলেই মনেপ্রাণে ও শরীরে বিশেষ শক্তি সঞ্চারিত হইয়া থাকে। এখন দেখা যাইতেছে যে বহু সম্প্রদায়ের শিষ্যভক্তগণ এমনকি জনসাধারণ 'জয়গুরু' বলিতেছেন। ইহা অবশ্য শুভ লক্ষণ। শুনিয়াছি, শ্রীমৎ সীতারামদাস ওঁকারনাথ শ্রীশ্রীঠাকুরের আশ্রমে আসিয়াছিলেন এবং হালিসহর আশ্রমে অবস্থানকালে তিনি জয়গুরু নাদধ্বনি লাভ করিয়া ঐ নামে মশগুল হইয়া গিয়াছিলেন। উদ্দও নৃত্য করিয়া এই নাম করিতেন। পরে ‘জয়গুরু নাম মাহাত্মা' নামে একখানা পুস্তিকাও রচনা করিয়াছিলেন। মহামিলন মঠ, সৎসঙ্গ সম্প্রদায় আদি বিভিন্ন সম্প্রদায় এই জয়গুরু নাম করেন। কলিযুগের তারকব্রহ্ম নাম হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ কৃষ্ণকৃষ্ণ হরে হরে'—ইত্যাদি করিলেও জয়গুরু মহানাম মুখে লইতে ভুলেন না। একবার ঠাকুর নিগমানন্দদেবের ভক্তগণ ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন—'তোমার
শিষ্যভক্ত বলিয়া জগতে পরিচয় দিব কিভাবে? অপরিচিত গুরুভাইদের সহিত সাক্ষাৎ হইলে জানিব কিরূপে সে গুরুভাই বলিয়া ? এই পরিপ্রেক্ষিতে ঠাকুর মহারাজ উত্তর করিয়াছিলেন—'কেন তোমরা মুখে “জয়গুরু" বলিলেই বুঝিতে পারিবে সে আমার শিষ্য বলিয়া।' সেইদিন হইতেই এই জয়গুরু মহানাম প্রবর্তিত হইয়াছে। রাস্তাঘাটে সকল গুরুভ্রাতা-ভগিনীগণ 'জয়গুরু' বলিতে শুরু করিলেন। জয়গুরু একটি সার্বভৌম ও অসাম্প্রদায়িক নাম। এই নাম সমগ্র বিশ্বে একদিন প্রচারিত হইবে। এই কথা ঠাকুর মহারাজ বলিয়াছেন। প্রেমাবতার শ্রীগৌরাঙ্গদের হরেকৃষ্ণ নাম সমগ্র বিশ্বে প্রচারিত হইবে বলিয়া মন্তব্য করিয়াছিলেন প্রায় ৫০০ বর্ষ পূর্বে। সেই নাম এখন সমগ্র বিশ্বে প্রচারিত হইয়াছে। তাঁহার উক্তি সত্য হইয়াছে। ঠাকুর নিগমানন্দদেবের উক্তিও সত্য হইবে—তাহার লক্ষণ বর্তমান হইতে পরিলক্ষিত হইতেছে।
জয় হইবে গুরুদেবের বা সদগুরুর। তাহার ইচ্ছাই পূর্ণ হইবে। সদগুরুর কোন বৈষয়িক বা জাগতিক কামনা-বাসনা নাই। তাঁহার কামনা শুধু শিষ্যভক্তদের কল্যাণের জন্য বিশ্বের মঙ্গলের জন্য। তিনি নিজের কল্যাণ প্রথমেই করিয়াছেন—অর্থাৎ তিনি জীবন্মুক্ত। কারণ এইজন্যই তো তিনি সাধনভজন করিয়াছিলেন—চতুর্বিধ সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন। জগদগুরুর নিকট হইতে গুরুগিরির ভার লইয়াছিলেন। তাই তাহার নিজস্ব কোন কামনা নাই। যতই সব শিষ্যভক্তদের জন্য। যে নিষ্কাম, যে জীবন্মুক্ত তাহার আর কি বা প্রয়োজন। তাই তিনি চান জীবের কল্যাণ বা মুক্তি। ত্রিতাপক্লিষ্ট জীব জগতে থাকিয়া কারারুদ্ধ বন্দীর মত কষ্টভোগ করিতেছে। এই সংসার-কারাগার হইতে সেই জীবকে মুক্ত করিয়া কিভাবে অধ্যাত্মপথে উন্নীত করিবেন সেই চিন্তাই তিনি সব সময় করেন। এইজন্যই তিনি সাধন- সমুদ্র মন্থন করিয়াছেন এবং মন্থনোদ্ভূত অমৃত লইয়া আসিয়াছেন জীবকে পান করাইয়া অমৃতধামে পৌঁছাইয়া দিবেন বলিয়া। কলিযুগের জীব নিজের বন্ধন বোঝে না এবং মুক্তি- মোক্ষও বোঝে না। সে মায়াধীন। কিন্তু সদগুরু মায়াধীশ। তিনি মায়াকে অতিক্রম করিয়াছেন। তাই মায়ার খেলা তাহার জানা। জীব মায়ার মোহে আবদ্ধ রহিয়াছে— এই কথা সে জানে না। সদগুরু মায়ার পাশ ছিন্ন করিয়া জীবকে অমৃতধামে টানিয়া লইবেন। জীবের জ্ঞাননেত্র উন্মোচন করিবেন। যে মানুষ তাহার চরণে শরণাপন্ন হইবে, গুরু তাঁহার দায়িত্ব নিজে বহন করিবেন এবং দেহান্তে মোক্ষদান করিবেন।
"জয়গুরু' মোহাতীত, দ্বন্দ্বাতীত শব্দ—তাই মুক্তি-মোক্ষদায়ক। 'গুরু' শব্দ ব্রহ্মবাচক। সদগুরু নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ এবং ব্রহ্মাই। অতএব 'জয়গুরু' বলিলেই মন স্বতঃ গুরুব্রহ্মের দিকে আকৃষ্ট হইবে। এইজনাই সবসময় 'জয়গুরু' 'জয়গুরু' বলিতে হয়। মুখে জয়গুরু' বলিলেই মানুষের চিত্তবৃত্তি শ্রীগুরুর প্রতি আকৃষ্ট হইবে। মানুষ চিরদিন সংসারে থাকিয়া সংসারের প্রতি বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া আছে। এই আকর্ষণ বন্ধনেরই কারণ, মানুষের চিত্তবৃত্তি যদি বিষয়ানন্দের প্রতি আকৃষ্ট না হইয়া ব্ৰহ্মানন্দে আকৃষ্ট হয় তাহা হইলে সে মোক্ষলাভ করিবে। ব্রহ্মানন্দ বলিতেই সামগ্রিক আনন্দ। এক একজন মানুষ এক একটা ক্ষুদ্র বিষয়কে লইয়া আনন্দ অনুভব করে। এই আনন্দ অতীব ক্ষুদ্র আনন্দ। আর ব্রহ্মানন্দ অসীম আনন্দ- বিরাট আনন্দ। ক্ষুদ্র আনন্দ একটি জলবিন্দু হইলে ব্রহ্মানন্দ সিন্ধুই। তাই 'জয়গুরু' নাম ব্রহ্মানন্দ। ‘জয়গুরু' নামের মধ্যে বিষয়ের কোন গন্ধই নাই। গুরু নির্বিষয় বা বিষয়াতীত। সদগুরু দ্বন্দ্বাতীত ও ‘ব্রহ্মানন্দ'। কারণ গুরুর প্রণামমন্ত্রে আমরা পাই—'ব্রহ্মানন্দং পরমসুখদং কেবলং জ্ঞানমূর্তিম্’—অর্থাৎ তিনি ব্রহ্মানন্দ, পরমসুখদ, তিনি কেবল (বা একমাত্র) এবং জ্ঞানমূর্তি। সুতরাং 'জয়গুরু' বলিলে সেখানে বিষয়ানন্দ নাই—আছে ব্রহ্মানন্দ, সেখানে দুঃখ নাই—আছে পরমসুখ, সেখানে বহু (বিষয়) নাই—আছে এক (ব্রহ্মা), সেখানে অজ্ঞান নাই—আছে জ্ঞান। অতএব ‘জয়গুরু' মহামন্ত্ৰই বা মোক্ষদায়কই। যেমন ব্রহ্মের বাচক হইল ওকার বা প্রণব তেমনি সদগুরুর বাচক হইল জয়গুরু। যেমন প্রণবের দ্বারা সমস্ত শুদ্ধ হইয়া যায় এবং ইহা উচ্চারণ করিলে স্মৃতিতে ব্রহ্মাই আসেন, তেমনি ‘জয়গুরু' বলিলে সদগুরু স্মৃতিতে আসিয়া যান বা ব্রহ্মচিন্তন হইয়া যায়। সদগুরু চিন্তন বা ব্রহ্মচিন্তনই মোক্ষের কারণ।
"জয়গুরু' মহানামের দ্বারা উভয় সগুণ ও নির্গুণেরই উপাসনা হইয়া যায়। পূর্বে বলা হইয়াছে নির্গুণব্ৰহ্মই ব্রহ্মাপদবাচ্য। সদগুরুর মধ্যে ব্রহ্মশক্তি বিদ্যমান বা তিনি নরাকারে পরব্রহ্ম। যাঁহারা কেবলমাত্র সদ্গুরুর মূর্তি চিন্তন করেন এবং ‘জয়গুরু' মন্ত্রদ্বারা উপাসনা করেন তাঁহারা সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্মেরই উপাসক। কারণ গুরুর মধ্যেই ব্রহ্ম। নির্গুণের উপাসনা সহজে হয় না। চাই একটি আধার। সেই আধার সদগুরুই। সদ্গুরুর উপাসনায় সগুণ ও নির্গুণ উভয়ের উপাসনা হইয়া থাকে। গুরু ভিন্ন সমস্ত উপাসনাই নিষ্ফল। সেই কারণে বলা হয় ‘গুরুকৃপাহি কেবলম্। উপাসনার মূলমন্ত্রই হইল সত্যদ্রষ্টা ঋষি নিগমানন্দের দেওয়া মহামন্ত্র ‘জয়গুরু’। শাস্ত্রে বলা হইয়াছে—“ঋষয়ঃ সত্যদ্রষ্টারঃ”। ঠাকুর নিগমানন্দ সত্যদ্রষ্টা, মন্ত্রদ্রষ্টা—তাই তিনি ঋষি নিগমানন্দ। ঋষি নিগমানন্দেরও দেওয়া অমোঘ মহামন্ত্র 'জয়গুরু' নাম মুখে লইলেই ব্রহ্মোপাসনা হইয়া থাকে।
শুধু সনাতন ধর্ম সম্প্রদায় নহে, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রীষ্ট, ইসলাম, ইহুদী সমস্ত সম্প্রদায় এই জয়গুরু মহানামের দ্বারা তাঁহাদের গুরুর জয় উচ্চারণ করিতে পারেন এবং ইহা দ্বারা ব্রহ্মোপাসনা বা ইষ্টোপাসনা করিতে পারেন।
শিষ্যের ইচ্ছা অপরিসীম। সমস্ত ইচ্ছা বা কামনাবাসনা বিষয়লিপ্ত, তাই বন্ধনের কারণ। বাড়ী গাড়ী, স্বত্ব-সম্পত্তি, ধন-জন, খ্যাতি-প্রতিপত্তি, নাম-যশ, ভোগবাসনা সবই চাই। গুরুদেবের এইসব চাওয়া-পাওয়া নাই। তিনি মায়াবদ্ধ জীবকে কিরূপে মোক্ষধামে টানিবেন সেই চিন্তাই করেন। সেই কারণে শিষ্যের জয় না দিয়া গুরুদেবেরই জয় দেওয়া হইয়াছে। এইখানেই 'জয়গুরু'র নামের মাহাত্ম্য। গুরু জ্ঞান, শিষ্য অজ্ঞান: গুরু মায়াধীশ, শিষ্য মায়াধীন শুরু ব্রহ্মানন্দ, শিষ্য বিষয়ানন্দ গুরু জীবন্মুক্ত, শিষ্য বদ্ধ জীব। তাহা হইলে শিষ্যের জয় দিলে বন্ধন, অজ্ঞান, সংসার-ভোগ, ক্লেশ অনিবার্য। তাই শিষ্যের জয় না দিয়া গুরুর জয় দেওয়া হইয়াছে বা ‘জয়গুরু' বলা হইয়াছে। হে গুরো। তোমার জয় হউক, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক্ আর আমার ইচ্ছা চূর্ণ হউক।' জীব সুখ চায়, দুঃখ চায় না : শাস্তি চায়, অশান্তি চায় না; মুক্তি চায়, বন্ধন চায় না; প্রভুত্ব চায়, দাসত্ব চায় না; আনন্দ চায়, নিরানন্দ চায় না। সত্যি সত্যি যদি জীব সুখ পাইতে ইচ্ছা করে, শান্তি, মুক্তি, প্রভুত্ব, আনন্দ চায়, তাহা হইলে 'জয়গুরু' বলিয়া ব্রহ্মোপাসনা করা চাই। “জয়গুরুই ব্রহ্মোপাসনার মহামন্ত্র। কিছু না জানিয়াও সদগুরুর শরণাপন্ন হইলেই মোক্ষ অনিবার্য।
'জয়গুরু' বলিয়া সম্ভাষণ করিলে ভাবের আদান-প্রদান করা হয়। কাউকে দেখিয়া “জয়গুরু' বলিলে তাহার মধ্যে গুরু বা ব্রহ্ম যে আছেন তাহা স্বীকার করা হয়। 'জয়গুরু' নাম আস্তিকতাবাদেরই লক্ষণ। ‘জয়গুরু' মন্ত্রের দ্বারা গুরুবাদ ও ব্রহ্মবাদকেও স্বীকার করা হয়। দ্বৈতবাদী, অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতাদ্বৈতবাদী বা সকলবাদীগণ জয়গুরু বলিতে পারেন। জয়গুরু' সমস্ত মতবাদেরই প্রতীক। ইহা একটি অপূর্ব সমন্বয়েরই মন্ত্র। ‘জয়গুরু' মন্ত্রে কোন বিবাদ থাকিতে পারে না— কোন দ্বন্দ্ব বা সংশয়ও থাকিতে পারে না। নিজের গুরু যখন ব্রহ্মা তখন তিনি সকলের মধ্যে বিদ্যমান। তাই এই জয়গুরু' মন্ত্র দ্বারা সকলকে সম্ভাষণ করা যাইতে পারে। ‘জয়গুরু' মন্ত্র মুখে উচ্চারণ করিলেই তাহার ধ্বনির তরঙ্গ মহাশুন্যে সর্বত্র বিচ্ছুরিত হইয়া যাইবে এবং তাহা সর্বময় বা ব্রহ্মময় হইবে—তাই 'জয়গুরু' মোক্ষেরই কারণ। জয়গুরু শব্দব্রহ্ম, জয়গুরু সর্ব মতপথের সমন্বয় মন্ত্র। সমস্ত মন্ত্রের মূল জয়গুরু। কারণ 'সর্বদেবময়ো গুরুঃ'। সমস্ত দেবতা গুরুর মধ্যে থাকায় গুরুর বাচক জয়গুরু হওয়ায় ইহা সমস্ত মন্ত্রের মূল।
বৃক্ষের সংক্ষিপ্ত অবস্থা যেমন বীজ, ব্রহ্মের বাচক যেমন ওঁ, তেমনি সদগুরু বা জগদগুরুর বাচক ‘জয়গুরু’। শ্রীশ্রীঠাকুর নিগমানন্দ এই 'জয়গুরু' মহামন্ত্রের প্রবর্তক বা উদ্গাতা। তিনি এই নাম প্রবর্তন করিয়া সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ দূর করিয়াছেন এবং এই মহানামই সমন্বয়ের সুর। সমস্ত মতপথ এই ‘জয়গুরু'র মধ্যে বিধৃত।
সূত্রঃ তত্ত্ব-দীপিকা - শ্রীমৎ স্বামী জ্ঞানানন্দ সরস্বতী
0 মন্তব্যসমূহ