মহাসাধক সদগুরু নিগমানন্দ ।। স্বামী জ্ঞানানন্দ সরস্বতী

 

আসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠ-প্রতিষ্ঠাতা পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রী ১০৮ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতীদের-প্রবর্তিত সনাতন ধর্মের মুখপত্র মাসিক পত্রিকা আর্য্যদর্পণের সুযোগ্য সম্পাদকবৃন্দ পরম শ্রদ্ধেয় স্বামী নির্বাণানন্দ-সত্যানন্দ-সিদ্ধানন্দ মহারাজগণের উত্তরাধিকারী সম্পাদকরূপে নির্বাচিত হওয়ায় আমি নির্বাচক একাদশ নিগমানন্দ—ট্রাষ্টবোর্ডের প্রতি আমার প্রাণের ঐকান্তিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি এবং আর্য্যদর্পণের অগণিত পাঠক-পাঠিকাবর্গকে আমার যথাযোগ্য সম্মান, প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা ও স্নেহাশিস্ জানাইতেছি। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ ও ভাবানুসৃত সনাতন ধর্মের মর্ম-রহস্যোদ্ঘাটনকারী স্ব-মহিমায় প্রতিষ্ঠিত আর্য্যদর্পণের মর্যাদা রক্ষা নিমিত্ত যাহাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে আপ্রাণ চেষ্টিত থাকিতে পারি—এইজন্য আমি শ্রীশ্রীঠাকুরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করিতেছি।



ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে লোকোত্তর পুরুষ পরমহংস স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতীদেবের আবির্ভাব হইয়াছিল পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের পূর্ব প্রান্তে পবিত্র ঝুলন পূর্ণিমার পুণ্যলগ্নে বিখ্যাত ভট্টাচার্য বংশে। তিনি পূর্বজন্মে ছিলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ গিরি। তন্ত্র-সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিয়া তিনি মহামায়ার মানবী-তনু পার্বতীকে স্বীয় পত্নীরূপে লাভ করেন। তন্ত্র-সাধনসিদ্ধ শিবকল্প ব্রহ্মানন্দই এই জন্মে নলিনীকান্তরূপে (পরে স্বামী নিগমানন্দ) পূর্ব সংস্কারানুসারে মহামায়া স্বরূপা সুধাংশুবালার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। স্বল্পদিনের মধ্যে অঘটন-ঘটনপটীয়সী মহামায়ার মায়ার লীলা-খেলা আরম্ভ হইয়া গেল। নলিনীকান্তের জীবনাকাশ হইতে চিরদিনের জন্য সুধাংশু অস্তমিত হইয়া গেলেন। অপূর্ব রূপলাবণ্যময়ী অনিন্দ্যসুন্দরী সর্বগুণালঙ্কতা মহাদেবী সুধাংশুবালার অকাল মহাপ্রয়াণে সুধা-রূপগুণমুগ্ধ বিরহবিধুর যুবক নলিনীকান্তের প্রাণের হাহাকার ও শোকসন্তাপিত চিত্ত সমুদ্রোথিত ঘূর্ণি বাত্যা ন্যায় তাঁহার মনকে সর্বদা আন্দোলিত করিতে লাগিল। সুধার জন্য পাগলপারা দিশাহারা নলিনীকান্ত তাঁহার ছায়ামূর্তি দর্শন করিয়া আরও পাগল হইয়া গেলেন। সতীহারা শিবের মতন সুধাহারা নলিনীকান্ত মনে প্রাণে প্রেততত্ত্বানুসন্ধিৎসার তীব্র সংবেগ লাভ করিলেন। কান্তাভাবের ব্যাকুলতা ও ছায়ামূর্তি- দর্শনই তাঁহার আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রথম সোপান। মহাত্মা তুলসীদাসের রত্নাবলী এবং বিল্বমঙ্গলের চিন্তামণির মতন নলিনীকান্তের আদিগুরু সুধাংশুবালাই। সুধাংশুবালার মহাপ্রয়াণ। বিনা নলিনীকান্তের আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ হইত না। মহামায়া তাঁহার ইচ্ছাকে রূপায়িত করিবার জন্য নলিনীকান্তের ভিতর দিয়া তন্ত্র, জ্ঞান, যোগ ও প্রেম-সাধনা করাইয়া তাহাকে চতুঃসাধনসিদ্ধ মহাপুরুষরূপে প্রতিষ্ঠিত করিলেন। পূর্ণ যৌবনে সুধাংশুবালারূপী মহামায়ার সঙ্গে মিলনের মহানন্দ এবং পরে তাহার আকস্মিক বিচ্ছেদজনিত তীব্র বিরহ-দুঃখ-যন্ত্রণা হৃদয়-প্রেম-পারাপারে গভীর শোকোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করিল। বিরহ-শোক সাগরে ক্রমনিমজ্জমান নলিনীকান্ত বারম্বার কান্তার ছায়ামূর্তিসন্দর্শনে পুনর্মিলনাকাঙ্ক্ষার ক্ষীণ আলোক রশ্মি দেখিতে পান। স্বপ্নে মন্ত্রপ্রাপ্তিতে নলিনীকান্তের শোকসন্তপ্ত প্রাণ কিঞ্চিৎ শীতল হইলেও মন্ত্রজপের কোন পদ্ধতি জানিতে না পারিয়া জীবনের আশা ত্যাগ করেন। পুনরায় মহামায়ার মহাকৌশলে তিনি তারাপীঠে আসেন নাদসিদ্ধ মহাকৌল বামাক্ষেপার নিকট। তন্ত্রসাধনার ফলস্বরূপ শিবের তথা সমস্ত দেবতাগণের পুঞ্জীভূত তেজপুঞ্জ হইতে সমুস্থতা দেবী চণ্ডিকার ন্যায় মহামায়া মা তারা তন্ত্র-সাধনারত সাধক নলিনীকান্তের অঙ্গ-নির্গত জ্যোতিঃপুঞ্জ হইতে আবির্ভূতা হইয়া মনোময়ী মূর্তি সুধাংশুবালারূপে দর্শন দিয়াছিলেন এবং শেষে সাধককে তাঁহার সেই বিরাট ভয়ঙ্করী তত্ত্বময়ী মূর্তি দর্শন করাইয়াছিলেন।

সাধক নলিনীকান্ত তাঁহার নয়নকনীনিকা মণি আদরের রাণীকে লাভ করিয়া পুনরায় কর্মস্থলীতে ফিরিয়া আসেন। স্কুলের সুধাংশুবালা আর চিন্ময়ী সুধাংশুবালার মধ্যে প্রভেদ দৃষ্টিগোচর হইলেও মূলতঃ তাঁহার সব রূপই এক—কর্ম সম্পাদনের জন্য বিভিন্নরূপে লীলাবরণ মাত্র। নলিনীকান্তকে মহাশক্তি মায়াশক্তিদ্বারা বন্ধন করিয়া ক্রমশঃই যেন তাহার অনন্ত কোলে টানিয়া লইলেন। আমরা গভীর চিন্তা দ্বারা তাহা বুঝিতে পারি, চিন্ময়ী মহাশক্তি সুধাংশুবালারূপে নলিনীকান্তকে দর্শনদান করিলেও ক্ষণপ্রভার মত তাঁহার হৃদয়াকাশে প্রতিভাত হইলেন। মহামায়ার লুকোচুরি (Hide and seek) মহাখেলায় সংযুক্ত হইয়াও নলিনীকান্ত তাহার মায়াকে বুঝিতে পারেন নাই। তাঁহার অঙ্গসম্ভূতা চিন্ময়ী প্রতিমাস্বরূপা সুধাংশুবালাকে আলিঙ্গন করিতে গিয়া তিনি হতোৎসাহ হইয়া যান। প্রেমালিঙ্গনকালে প্রেমবশে প্রেমিকের দেহে প্রেয়সী-প্রতিমার বিলয় অত্যাশ্চর্য ঘটনা। তাহা না হইলে নলিনীকান্তের সংসারত্যাগ, বেদাদি শাস্ত্রাধ্যয়ন, বৈদিকী সন্ন্যাসদীক্ষা, জ্ঞানসাধনা, যোগসাধনা, প্রেমসাধনা কিছুই হইত না। জীবনের পট পরিবর্তন আরম্ভ হইল। অবশেষে মা তারার ইঙ্গিতে মহাকৌল তান্ত্রিকগুরু বামাক্ষেপার নির্দেশে তিনি চিরতরে সংসার ত্যাগ করেন।

রাজস্থানের কোটাজঙ্গলে মহামায়া যোগিনীর বেশে তন্ত্র ও জ্ঞানসিদ্ধ সাধক নিগমানন্দকে যোগীগুরুপ্রাপ্তির সন্ধান দেন। যোগসাধনার পর নির্বিকল্প সমাধিপ্রাপ্ত নিগমানন্দ কাশীতে অন্নপূর্ণাকে পরীক্ষা করিতে যাইয়া ঠকিয়া যান এবং শেষে প্রেমরসঘনবিগ্রহ ধারিণী মৃত্যুঞ্জয়িনী চিরযৌবনা মহামায়াস্বরূপা প্রেমসিদ্ধা গৌরীমায়ের প্রেমকৃপাপ্রাপ্ত হইয়া পূর্ণব্রহ্ম হইলেন।

“গারোহিল যোগাশ্রমে" প্রেমময়ী মূর্তশিব নিগমানন্দের সঙ্গে তাঁহার প্রেমিকারূপে প্রেমিকের বাসরঘরে সম্মিলিতা হইলেন। নির্বিকল্প সমাধিব্যুথিত 'আমি গুরু’অহংবাদী নিগমানন্দ চিরাকাঙ্ক্ষিতা প্রেমিকার প্রেমরস-পারাবারে নিমজ্জিত হইয়া সংসারের ত্রিতাপক্লিষ্ট জীবের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ না করায় আবার সেই মহামায়া মহাপ্রেমময়ী নিগমানন্দের সঙ্গে জীবোদ্ধারের জন্য কন্ট্রাক্টে অঙ্গীকার করিয়া লোকালয়ে পাঠাইলেন।

মহাশক্তি তাঁহার মহান্ আশীর্বাদে সমস্ত শৃঙ্খল মোচন করিয়া নলিনীকান্তকে নিগমানন্দ- রূপে প্রতিষ্ঠিত করিলেন। নিগমানন্দদেবের সেবা করিবার জন্য প্রেমময়ী ভৈরবী মায়ের মধ্যে আবিষ্টা হইয়াছিলেন। পরমহংস নিগমানন্দদেবের হৃৎপিণ্ড-যন্ত্রণার উপশমনার্থে তাহার বক্ষে তিনি হস্ত সঞ্চালন করিয়াছিলেন এবং তাহাকে সর্বশেষ সতর্কবাণী শুনাইয়াছিলেন—“তুমি আমার, আমি তোমার ; কিন্তু তুমি আমাকে ভুলিয়া তোমার শিষ্যভক্তকে ভালবাসা দিতেছ। সেই ভালবাসা স্থায়ী ভালবাসা নয়।” তবুও শিষ্যভক্তদের প্রতি তাঁহার ভালবাসার অন্ত নাই। তিনি বলিয়াছেন—“হ্যাঁরে! আমি তোদেরকে পাইয়া ঈশ্বরকে ভুলিয়াছি। তোরা কি আমার ভোলার বস্তু? তোরা যে আমার হৃদয়-নিকুঞ্জের দোহেলা। তোদের প্রভাতী তানেই না আমি প্রাণ ঢালিয়া দিয়াছি! কেবল দেখিতেছি, কার কূজনে প্রাণে কিরূপ তরঙ্গ বহিয়া যায়।"

নিগমানন্দদেবের প্রতি মহাশক্তির দৃষ্টি ও ভালবাসা, নিগমানন্দদেবেরও মহাশক্তির প্রতি ভালবাসার সীমা কল্পনাতীত। দুই অসীমের সীমাহীন প্রেম। তাই নিগমানন্দদেব তাঁহার প্রেমিকগুরু গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে লিখিয়াছেন—

“প্রেমময়ি! তোমার প্রেম-প্লাবনের ‘পলি' পড়িয়াই না এ ঊষর হৃদি সরস হইয়াছিল। আমি অন্ধকার মাঝে দিশেহারা হইয়া ঘুরিতেছিলাম, তুমিই না প্রথমে প্রেমের আলো জ্বালিয়া হৃদয় দেখাইয়াছিলে? তুমিই গুরুরূপে এ সুপ্ত প্রাণে প্রেমবীজ উপ্ত করিয়াছিলে। সেই বীজে বৃক্ষ জন্মিয়া কিরূপ ফুল-ফল প্রসব করিতেছে, তাহার নিদর্শনস্বরূপ এই ‘প্রেমিকগুরু' পুস্তকখানি তোমার উদ্দেশ্যে নিবেদন করিলাম।

“আর একটি কথা—কিন্তু রাজরাজেশ্বরীকে সে কথা বলিতে স্বতঃই সাহস হয় না- এই ফুলে চোখের জল মিশাইয়া তোমার পূজা না করিলে আমার তৃপ্তি হইবে না। এস, রসময়ি! মনোময়ী মূর্তিতে আমার হৃদয়াসনে বসিয়া পূজা লও। তোমার প্রেম-পাথারে আমার প্রেম-প্রবাহ মিশিয়া লয় হইয়া যাউক— সিন্ধুতে বিন্দু মিলিত হউক। ওগো! তাই তোমায় ডাকি—

করুণা করিয়া—প্রেমে ভাসাইয়া পাষাণ গলায়ে যাও। আসিয়া আমার উপহার গ্রহণ কর।

তোমার প্রেমভিখারী-

শ্রীনলিনীকান্ত”

এই হইল মহাশক্তির সঙ্গে নিগমানন্দের মহাপ্রেম। আজ তাঁহারই পবিত্র জন্মমাসে তাঁহার শ্রীপাদপদ্মে অঞ্জলিস্বরূপ আশীর্বাদপ্রার্থী দীনাতিদীনের এই ভক্তিশ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন। মহাশক্তির শ্রীচরণে বারবার প্রণাম জানাইতেছি—

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। সেই মহাশক্তির প্রেমে মুগ্ধ শ্রীশ্রীনিগমানন্দের শ্রীচরণসরোজে বারবার প্রণাম নিবেদন করি—

নমো নমস্তেহস্ত সহস্ৰকৃত্বঃ

পুনশ্চ ভূয়োঽপি নমো নমস্তে ৷৷




সূত্রঃ © তত্ত্ব-দীপিকা / শ্রীমৎ স্বামী জ্ঞানানন্দ সরস্বতী


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ