শ্রীশ্রীসরস্বতী || শ্রীমৎ স্বামী নিগমানন্দ পরমহংসদেব



চিন্ময়ী সরস্বতী আজ মৃন্ময়ী দেবীরূপে বঙ্গধামে উদয় হইয়াছেন। সরস্বতীমূর্তি সৌন্দর্য্য ও মাধুর্য্যের উৎস। প্রেমময়ীর প্রেমমুগ্ধ বঙ্কিম ভাব, -শ্বেত শতদলে পদে পদ রাখিয়া ত্রিভঙ্গঠামে দাঁড়াইয়া আছেন। শ্বেত-বরণে দেবী মনোহরা;-শিরে উজ্জ্বল কিরীট, কর্ণে কুণ্ডল, গলায় গজমুক্তার হার-শ্বেতাঙ্গিনীর সমস্ত অঙ্গ উৎকৃষ্ট রত্নভূষণে ভূষিত। মুখে মৃদু-মধুর হাস্যবিকাশ। গাত্রে জ্বলদগ্নিসম পীতাম্বর-সর্ব্বাঙ্গে বাসন্তী মাধুরী, চিরযৌবনা নবলাবণ্যে বিমোহিনী; মোহিনীর নিতম্বচুম্বিত চিকুরদামে কত কুন্দকলি বিকশিত; করকমলে বীণা, কুঞ্জকাননের কুজন-রবে ঝঙ্কারিত হইতেছে। ভক্তমানস মানসসরোবরের শ্বেতহংসমূর্তিতে দেবীর পদপ্রান্তে আনন্দে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। চৈতন্যময়ীর পদতলে সমস্ত পাণ্ডিত্য, জ্ঞান ও শাস্ত্র সমর্পণ করিয়া সবাই সমভক্তিতে পবিত্রমনে দেবীকে আরাধনা করিতেছে-তাঁহার পদকমলে পুষ্পাঞ্জলি দিতেছে। পূজার সমস্ত শ্বেতবর্ণ উপকরণ-সুগন্ধি শ্বেতপুষ্প, শ্বেতচন্দন, শ্বেতবর্ণ বস্ত্র, মনোহর শ্বেতশঙ্খ, শ্বেতপুষ্পের মালা, শ্বেতপদ্ম ও শ্বেতবর্ণের ভূষণ। এ যে পুণ্যের প্রতিমা, পবিত্রতার পূজা; তাই মূর্তি শুদ্ধ-সত্ত্বরূপিণী শ্বেতাঙ্গিনী ও তাঁহার সমস্ত শুভ্রময়।

পাঠক! বসন্তকালের বাহ্যভাব একবার চাহিয়া দেখুন। আজি পুরাতন ও মৃতপ্রায়, শীতে জর জর শীর্ণকলেবরা পৃথিবী যেন নবজীবনে সঞ্জীবিতা হইয়া উঠিয়া নবশোভা ধারণ করিয়াছে। এই মধুর বসন্তকালে প্রকৃতি শত শোভায় শোভিতা। বনে বল্লরীসকল মৃদুসমীরণে নৃত্য করিতেছে। তরুরাজি নব-কিশলয়ে নানাবর্ণে রঞ্জিত হইয়াছে, প্রসূনরাশি তরুরাজিকে শোভিত করিয়াছে। বঙ্গদেশে ঋতুরাজ বসন্তের রমণীয়তা সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত। কুসুমাকর সর্ব্বত্রই কুসুমমালায় সুশোভিত। কিশলয়কান্তিও কুসুমের সৌন্দর্য্যে সুরঞ্জিত। বনবল্লরীর নৃত্য ও হাস্য কুসুমশোভাকে বুঝি পরাজিত করে। মুকুলমালাও ফুলকুলবিজয়িনী। কত বিচিত্র বর্ণের রাগরঞ্জন চারিদিকে বিকশিত হইয়াছে। উল্লাসে পিকবধূ অন্যান্য বনবিহঙ্গ সঙ্গে রঙ্গে তান ধরিয়াছে। মধুকরনিকর কুঞ্জে কুঞ্জে গুঞ্জরিয়া বেড়াইতেছে, মলয়ানিল মৃদুহিল্লোলে ভ্রমণ করিয়া পুষ্পসৌরভে চারিদিক পরিপূর্ণ করতঃ মধুরতা সঞ্চারিত করিতেছে। চারিদিকে সৌন্দর্য্য আর মাধুর্য্য, সুষমা আর শোভা। ঋতুরাজ আজ প্রকৃতিসুন্দরীকে বসন্তের নব সৌন্দর্য্যে সাজাইয়াছেন। জগৎপতি আজি প্রেমময়ী প্রকৃতিসুন্দরীর লীলায় অনুরক্ত। সংসার প্রফুল্লতায় হাসিতেছে, আনন্দময়ীয় সংসারধাম নব-রসে সঞ্জীবিত হইয়া উঠিয়াছে।

সরস্বতীপ্রতিমা বাসন্তী-প্রকৃতির প্রাথমিক ছবি কিম্বা প্রকৃতিদেবীর প্রেমলীলার ঐশ্বর্য্যময় বিকাশ বসন্ত। আর্য্যঋষিগণ বসন্তকালের শোভাময় বিশ্বদৃশ্যমধ্যে অবস্থিত হইয়া আত্মহারা হইয়া গেলেন। ধ্যানে তাঁহারা প্রকৃতির যে রূপ দেখিলেন, সেই রূপে তাঁহাকে হৃদয়-মন্দিরে স্থাপিত করিয়া তাঁহার আরাধনা করিলেন। আর্য্যঋষিগণ তখন বিশ্বের বাসন্তী সৌন্দর্য্যধামে সেই সরস্বতীদেবীকে প্রতিষ্ঠিত করিলেন। পাঠক। সরস্বতীমূর্ত্তি হিন্দুদিগের অজ্ঞানবিস্তৃম্ভিত পুতুলখেলা নহে। উহা ঋতুরাজ বসন্তকালের বাসন্তী-সৌন্দর্য্যময় বিশ্বে বিশ্বেশ্বরের আরাধনা।

বসন্ত-সজ্জিত শোভাময় প্রকৃতি-মন্দিরের দ্বারদেশে প্রথমেই জ্ঞানদেবী। সেই বসন্তসজ্জামাঝে বিদ্যাদেবীর মূর্তি যত মোহনভাবে গড়িতে হয়, আর্য্যঋষির কল্পনা তাহা গড়িয়া গিয়াছে। সেই মূর্তি সরস্বতী-ব্রহ্মাণ্ডের শতদল তাঁহার পদতলে, জ্ঞানাকর্ষিণী মধুময়ী বীণা তাঁহার করতলে, মোহকরী শ্রী ও লাবণ্য তাঁহার মুখমণ্ডলে, জয়ের উজ্জ্বল কিরীট তাঁহার কুন্তলে-আর সাত্ত্বিক জ্ঞানরূপ পবিত্র বিশদ বরণের বিমলতা তাঁহার বক্ষঃস্থলে। এইরূপে তত্ত্বজ্ঞানরূপিণী সরস্বতী ঋষি-হৃদয়ে আবির্ভূতা হইয়াছিলেন। সেই সরস্বতীর রূপ আজিও জগজ্জনের মনোহরণ করিয়া রহিয়াছে। সাধারণ লোকসকল সরস্বতীর বাহ্যবিকাশ বাসন্তীশোভায় মোহিত হইল। আর ভক্ত-সাধক অন্তর-রাজ্যের সৌন্দর্য্য দেখিবার জন্য বিদ্যাদেবীর ধ্যান ও আরাধনায় প্রবৃত্ত হইলেন। দিব্যচক্ষু ব্যতীত সে রূপ-সে সৌন্দর্য্য দেখা যায় না। দিব্যচক্ষু লাভ করিতে হইলে জ্ঞানের সাধনার প্রয়োজন। সাধনায় ক্রমশঃ ষড়রিপু ও পঞ্চেন্দ্রিয়ের সংযম করিতে পারিলে অজ্ঞান-আঁধার দূরীভূত হইয়া সাধকের হৃদয়ে বাসন্তী-পঞ্চমীর জ্যোৎস্নার ন্যায় জ্ঞানালোক ফুটিয়া উঠিবে। সেই পঞ্চমীতে দেবী সাধককে দেখা দিবেন। সাধক তখন দেখিবেন, সেই দেবীই জগতের সমস্ত শোভার লাবণ্য ও শ্রী; সমগ্র বসন্তদেশকে দেবী আলোকিত করিয়াছেন। তখন তত্ত্বজ্ঞান লাভ হইয়া থাকে। দেবী তাঁহাকে সেই বাসন্তী-জগতের অভ্যন্তর প্রদেশে প্রবেশলাভের অধিকার দিয়া জ্ঞানের মন্দির-দ্বার মুক্ত করিয়া দিবেন। তখন স্কুলপ্রকৃতি ভেদ করিয়া জ্ঞান-দ্বার দিয়া বিজ্ঞানধাম অতিক্রম করিলেই দেবীর মহারাসের মহামঞ্চ দৃষ্টিগোচর হইবে। এখানে দেবী স্ব-স্বরূপে অর্থাৎ প্রকৃতি-পুরুষরূপে রাধাশ্যামমূর্তিতে বসন্তকালের সমস্ত শোভা সম্পাদন করিয়া মদনোৎসব-দোললীলা করিতেছেন। তখন সাধক দেখিবেন, শ্রীপঞ্চমীর ক্ষীণালোক গিয়া বাসন্তী-পূর্ণিমার দিব্য জ্যোতিতে হৃদয়-আকাশ ভরিয়া গিয়াছে।

এক্ষণে সরস্বতীদেবীর আরাধনায় কেন কৈবল্য সাধিত হয়, তাহার কারণ প্রদর্শন করা হইতেছে। সংক্ষেপতঃ সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনা করিয়া এ বিষয়ের মীমাংসা করা যাউক। পরমতত্ত্ব পরমাত্মা সৃষ্টি করিবার বাসনা করেন, ব্রহ্মের বাসনা হইলেই সেই নির্গুণ সত্তা সগুণ হইলেন, আর সেই বাসনাই জীবসৃষ্টির কারণ হইলেন। যেমন ফুল হইতে ফল হয়, তেমনি নির্গুণ ব্রহ্ম হইতে ঈশ্বর হইলেন, এবং সেই বাসনাই জীবের আদিকারণভূতা হইলেন। ইঁহারাই সাংখ্যদর্শনের প্রকৃতি ও পুরুষ। প্রকৃতি-পুরুষের অধ্যাসে সগুণ (ক্রিয়াশীল) সৃষ্টিকারিণী শক্তিরূপে পরিণত হইলে অহঙ্কার-তত্ত্বের আবির্ভাবে তন্মাত্রসাকল্যে এই জগতের সৃষ্টি করেন। প্রকৃতি জগতের উপাদান এবং পুরুষ নিমিত্ত-কারণ। প্রকৃতি আবার দ্বিবিধা-পরাপ্রকৃতি ও অপরাপ্রকৃতি। ব্রহ্মে সৃষ্টি-বাসনা হইলে তিনি সগুণ হইলেন, তাঁহার যে সৃষ্টিবাসনা-তিনি পরাপ্রকৃতি; পরাপ্রকৃতিকে পুরুষ ক্ষোভিত করিতে আরম্ভ করিলে তাঁহার অবস্থা দ্বারা প্রকৃতির তমঃ রজঃ ও সত্ত্ব, এই ত্রিবিধ গুণ অভিব্যক্ত হইল। সেই গুণত্রয় হইতে ক্রিয়াশক্তি হইল, এই ক্রিয়াশক্তি অপরাপ্রকৃতি। অতএব জীব-জগতের সৃষ্টিকার্য্যে দার্শনিকগণ তিনটী অবস্থা বা বৈজিক ব্যাপারের অনুমান করিয়া থাকেন। যথা পরাপ্রকৃতি, অপরাপ্রকৃতি এবং বিন্দু।


আসীচ্ছক্তি-স্ততো নাদো নাদাদ্বিন্দুসমুদ্ভবঃ।

— সারদাতিলক


বিন্দু শব্দব্রহ্মের অব্যক্ত ত্রিগুণ এবং চিদংশবীজ, এই বিন্দুই শক্তিতত্ত্ব। এই চিদংশবীজ চিদচিন্মিশ্রিত নাদের মধ্যবর্তী। এই শক্তিতত্ত্ব হইতেই জগতের সৃষ্টি অনুসৃত। অতএব বাসনা জীব হইবার আগেই সৃষ্ট হইয়াছেন, প্রকৃতি, মায়া, অবিদ্যা বা আর যাহা কিছু বলুন, তাহাতেই জীব জাত, বর্দ্ধিত ও সংস্থিত।

সগুণ-ব্রহ্ম বা পুরুষ ত্রিগুণে ত্রিশক্তিধারী। কাল, চৈতন্য ও সৎ এই তিনটী নিত্য চৈতন্যময় বস্তুর ক্রিয়াপর অবস্থাই তিনটি শক্তি। এই তিন শক্তিকে ঈশ্বর বশীভূত করিয়া ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবরূপে জীব-জগতের সৃজন, পালন ও লয় করিয়া থাকেন। ব্রহ্মার সৃষ্টিকারিণী শক্তির নাম-সরস্বতী, বিষ্ণুর পালনকারিণী শক্তির নাম-লক্ষ্মী এবং শিবের লয়কারিণী শক্তির নাম-কালী। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব ইঁহারা ভিন্ন নহেন, ঈশ্বরের গুণত্রয়ের ক্রমবিকাশ অবস্থা মাত্র। ঈশ্বরের কারণ, সূক্ষ্ম ও স্কুলে পরিণত অবস্থাই শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মা, এবং যে শক্তির দ্বারা উক্ত ত্রিবিধরূপে পরিণত হ'ন, সেই শক্তির নামই কালী, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। সুতরাং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব এই তিনে যেমন এক, তেমনি ত্রিশক্তিও অভিন্না। আবার শক্তি ও শক্তিমানে অভেদবশতঃ ব্রহ্মা ও সরস্বতী, বিষ্ণু ও লক্ষ্মী এবং শিব ও কালী ইঁহারাও পরস্পর অভিন্ন। প্রাণ এবং দেহে যেরূপ সম্বন্ধ, শক্তি ও শক্তিমানেও তদ্রূপ সম্বন্ধ। প্রাণ ব্যতীত যেমন দেহ বিকল, তদ্রূপ শক্তি ব্যতীত পুরুষ শবমাত্র। উভয়ে আধার-আধেয়ভাবে গুণের কার্য্য করিতেছেন। ত্রিশক্তির সমন্বয়ীভাবই গায়ত্রীদেবী। সুতরাং গায়ত্রী-উপাসনা দ্বারা বেদ সগুণব্রহ্মের উপাসনাই নিদ্দিষ্ট করিয়াছেন। কিন্তু যে সকল নিম্নাধিকারী জনগণ বেদ-প্রতিপাদিত ঈশ্বরের এই সার্ব্বভৌমভাব ধ্যান-ধারণায় আনিতে পারে না, তাহাদিগের জন্য পুরাণে পৃথক্ পৃথক্ শক্তির আরাধনার বিধি আছে। তাই হিন্দুসমাজে অধিকারিভেদে কেহ ব্রহ্মা ও সরস্বতীর, কেহ বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর এবং কেহ বা শিব ও কালীর উপাসনা করিয়া থাকেন। মূলে তিনই অভিন্ন সুতরাং একজনের আরাধনায় তিনেরই আরাধনা হইয়া থাকে। তবে প্রথম অধিকারীকে ব্রহ্মা ও সরস্বতীর আরাধনা করা কর্তব্য। কেননা, ব্রহ্মাই প্রকৃতির কার্য্যাবস্থা বা স্থূল বিকাশ। স্কুল জগতের জীবকে স্কুলের ভিতর দিয়াই কারণে যাইতে হইবে। জন্মজন্মান্তরের সাধনায় যাহাদিগের উচ্চ অধিকার জন্মিয়াছে, তাহারা সূক্ষ্ম ও কারণাবস্থারও উপাসনা করিতে পারে। ব্রহ্মের স্কুল পরিণামই বিরাটপুরুষ ব্রহ্মা, এবং তাঁহার শক্তি সরস্বতী দেবী। সরস্বতী ও ব্রহ্মা অভিন্ন, ব্রহ্মা দেহ এবং সরস্বতী প্রাণ; সুতরাং সরস্বতীর উপাসনাই বিরাটপুরুষ ব্রহ্মার উপাসনা। আবার স্থূল জগতের রূপ বসন্তকালেই পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্বিভূতিবর্ণনাকালে অর্জুনকে বলিয়াছিলেন- "ঋতুনাং কুসুমাকরঃ” অর্থাৎ "ঋতুসকলের মধ্যে আমি বসন্ত"। তাই বসন্তকালে বিরাশক্তি সরস্বতীর পূজা নিদ্দিষ্ট হইয়াছে এবং স্থূল প্রকৃতির বাসন্তী-সজ্জা হইতে উপকরণ সংগ্রহ করিয়া সরস্বতীপ্রতিমা নির্মিত হইয়াছে। পাঠক! হিন্দুঋষি ব্যতীত আর কেহ কবিত্বের তুলিতে এমন অধ্যাত্ম-চিত্র চিত্রিত করিতে সক্ষম হইয়াছে কি?

সরস্বতীদেবীকে বাসন্তী-সৌন্দর্য্য-সুশোভিত বিরাট ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত করিয়া আরাধনা করিতে হইবে। বিদ্যাদেবীর আরাধনা না করিলে কে আমাদিগকে তত্ত্বজ্ঞানে লইয়া যাইবে? কর্মকাণ্ড দ্বারা চিত্ত পরিশুদ্ধ হইয়া যখন বাসন্তী-পঞ্চমীর নির্মল চন্দ্রালোকের ন্যায় জ্ঞানের উন্মেষ হইবে, তখনই সাধক জ্ঞানানুশীলনের অধিকারী হন; তাই বসন্তের শুক্লাপঞ্চমীতে বিদ্যাদেবীর আরাধনার ব্যবস্থা হইয়াছে। বিদ্যাদেবীর আরাধনায় সাধক জ্ঞানালোকে প্রকৃতি-মন্দিরে প্রবিষ্ট হন।

প্রথমতঃ প্রকৃতির কার্য্যময় স্কুল অবস্থা অতিক্রম করিয়া কারণময় সূক্ষ্ম অবস্থা অবগত হন, তৎপরে ফলময় কারণ অবস্থা ছাড়াইয়া বিশুদ্ধ তুরীয়ভাবে উপনীত হয়েন। এই চতুর্ব্বিধ অবস্থা লইয়াই পুরাণে ব্রহ্মার চারিমুখের কল্পনা করা হইয়াছে।

সরস্বতী-আরাধনায় সাধক কেন ও কিরূপে ব্রহ্মধামে উপনীত হয়েন, তাহা বোধহয় সকলেই বুঝিতে পারিয়াছেন। বিদ্যাদেবীর আরাধনায় অর্থাৎ জ্ঞানালোচনায় অবিদ্যা দুরীভূত হয়। অবিদ্যা অন্তর্হিত হইলে অপরা-প্রকৃতির পরিণাম স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ অবস্থা অতিক্রম করিয়া পরা-প্রকৃতির রাজ্যে গতি হয়। তখন চিৎ-জ্যোতিঃ প্রকাশিত হইয়া থাকে। সে জ্যোতিঃতে ভগবানের স্বরূপশক্তি সাধকের নয়নগোচর হয়; তখন সাধক স্পষ্ট বুঝিতে পারেন যে, এই চিৎশক্তি নিত্য ভগবানে প্রতিষ্ঠিত। অনাদিকাল হইতে ভগবান্ সংসারী এবং চিৎশক্তিতে আসক্ত। তাঁহাদিগের কী গভীর ও স্থায়ী প্রণয়। অনাদি কাল হইতে এই প্রেম চলিয়া আসিতেছে। পরাপ্রকৃতি তাই যথার্থ সতী নামের পাত্রী। তাঁহাদের প্রেম অতুল্য, নিত্য ও অপ্রমেয়। সাধক তখন স্পষ্ট দেখিতে পান এই সচরাচর জগতের স্কুল, সূক্ষ্ম ও কারণের মঞ্চোপরি পরমপুরুষ মদনমোহনরূপে স্বরূপশক্তি শ্রীরাধার সহিত তালে তালে দুলিতেছেন। এই তত্ত্বপূর্ণ ভাবই ভক্ত-হৃদয়ের দোললীলা। পাঠক! সরস্বতীতত্ত্ব এবং তাঁহার আরাধনার সার্থকতা বুঝিলেন কি? শ্রীপঞ্চমীতে বিদ্যাদেবীর আরাধনা আরম্ভ করিলে ক্রমশঃ হৃদয়ের বাসন্তী-পূর্ণিমা বিকশিত হইবে। সে আলোকে তোমার অহংজ্ঞান দোলমঞ্চে পরিণত হইবে। প্রকৃতি-পুরুষ তখন সমস্ত বাসন্তী-শোভা প্রকটিত করিয়া সেই মঞ্চে দাঁড়াইয়া দুলিতে থাকিবেন, ভক্ত সে ভাব-সাগরে চিরদিনের মত নিমগ্ন হইয়া যাইবেন। এস পাঠক! আমরা আজ বসন্তের প্রথম বিকাশে সেই অজ্ঞাননাশিনী, চৈতন্যরূপিণী, কৈবল্যপ্রদায়িনী সরস্বতীদেবীর অতুল রাতুল চরণের উদ্দেশে প্রণাম করি—

সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোহস্তু তে।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ হরিঃ ওম্।



তথ্যসূত্র: তত্ত্বমালা || শ্রীশ্রীঠাকুর নিগমানন্দ পরমহংসদেব


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ