সন্তান পিতা মাতার কাছে এক মহানন্দময় দায়িত্ব স্বরূপ। পিতা-মাতার শুধু ধারণ- পোষনের দায়িত্বই নয় শিক্ষার দায়িত্বও তাদেরই। অতি নিঃসহায় একটি জীব ভগবান তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, তার মাঝে ভগবানের শুভেচ্ছার বীজ নিহিত রয়েছে___ স্নেহে, কল্যাণে তাকি অঙ্কুরিত করে তুলবার জন্য। আমরা বড় হয়ে এখন বুঝেছি, মনুষ্যত্ব,দেবত্ব,ইশ্বরত্ব,ব্রহ্মত্ব লাভ করা আমাদের লক্ষ্য। আজ বড় হওয়ার পরেই যে এই লক্ষ্যই দাঁড়িয়েছে,তা তো নয়, আমার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এই লক্ষ্য নিয়েই জন্মেছিলাম। আমি তখন তা বুঝতে পারিনি, কাজেই সেই মতে চলতে পারি নি, কিন্তু পিতা-মাতাকে তো ভগবান আমার হয়ে বুঝবার ভার দিয়েছিল। প্রত্যেক পিতা-মাতা যদি নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করে সন্তানের কথা এইভাবে ভাবেন, তবে সন্তানের প্রতি তাদের কর্তব্য কত বেড়ে যায়! অতি শৈশব হাতে এমনকি গর্ভস্থ ভ্রূণের অবস্থায়___ চাই কি তারও পূর্বে গর্ভাধানের সময় হতে মনুষ্য জীবনের চরম লক্ষ্যের কথা স্মরণ করে একটা মনুষ্য জীবনের পত্তন করতে হলে পিতা-মাতাকে কত উচ্চভূমিতে অবস্থান করতে হয়, তা সকলেরই চিন্তার বিষয়।
মা অপরের মাঝে পরিস্ফুট রয়েছে, আমাদের পরিস্ফূট বৃত্তির সহায়ে তাকে ফুটিয়ে তোলাকেই না আমরা বলি শিক্ষা! আমরা অপরের মাঝে কোন জিনিসটা ফুটিয়ে তুলতে চাই___আমাদের মাঝেই বা কোন জিনিসটা ফুটে উঠলে আমরা নিজেকে সার্থক মনে করি? ধর্মভাব,সত্যভাব আমাদের মাঝে ফুটুকু,এই আমরা চাই। একথা সকলে বোঝে না___আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে জীবনের আর সকল উদ্দেশ্যেরই বিরোধ আছে, এটা অধিকাংশ লোকেরই ধারণা। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আত্মা সর্বব্যাপী; সুতরাং যে যতই বলি না কেন, তাকে ছেড়ে আমরা যেমন কিছুই করতে পারিনা, তেমনি তার অনুশীলনের সঙ্গে জগতের কোন কর্তব্যের বিরোধ হতে পারে, এও সম্ভব নয়। আধ্যাত্বিক থেকেও সংসার করা যায়, ধন উপার্জন করা যায়, রাজ্য পরিচালনা করা চলে। তবে দেখি কেন, সংসারের মানুষ জীবনটাকে দুই ভাগ করে একভাগ সংসারের জন্য, আর এক ভাগ ধর্মের জন্য রাখতে চায়___সংসার থেকে ভগবান মিলে না, এমন কথাই বা বলে কেন?
এর একমাত্র কারণ হচ্ছে শিক্ষার অভাব কিংবা কুশিক্ষা। সাধারণ লোকের কাছে আধ্যাত্মিক চর্চাটা এত কঠিন কসরৎ বলে মনে হয় কেন? কারণ যে সময়ে যা করা উচিত ছিল, তা করবার শিক্ষা এরা পায়নি। আজ আধ্যাত্ম জগতে প্রবেশ করতে গিয়ে অত বাধার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে, কিন্তু এতগুলি বাধাকে কেন স্তূপাকার হতে দেওয়া হল? এর পূর্বে কি এদিকে তাকাবার কারো ফুরসৎ হয়নি? এখন না হয় সাংসারিক দায়িত্বে দুদিকের তাল সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে; কিন্তু ছেলেবেলায় তো সংসারের দায়িত্ব ছিল না, তখন কেন ভবিষ্যৎ জীবন যুদ্ধের উপযোগী রসদ সঞ্চয় করে রাখা হলো না? শিশু এ কথা ভাবতে না পারলেও শিশুর পিতা -মাতার এ কথাটা ভাবা উচিত ছিল।
শৈশবের অবসর কালে, চিত্ত যখন ননীর মতো কোমল, ভালোবাসার ক্ষমতা যখন অফুরন্ত, সেই সময় যদি পিতা-মাতা আপ্রাণ চেষ্টায় সব ভাবের বীজ বপন করে দেন, তবেই সকলেরই কর্মজীবন সুখের হতে পারে,____সংসারে থেকেও ভগবান লাভের একটা সুরাহা হতে পারে। ধর্ম লাভের এমন অখণ্ড অবসর পরে আর কখনো মিলবে না। আর গোড়ায় এই শিক্ষা নিয়ে মানুষ হতে পারলে ভবিষ্যতের কোন সংখ্যাটি পর্যু্্যদস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
সন্তান সম্বন্ধে মায়ের চেয়ে পিতার চিন্তা ও কর্তব্য বুদ্ধি বেশি দেখা যায়। ভবিষ্যতে ছেলের অন্নসংস্থান করবার জন্য পিতা যতটা ব্যস্ত হন,তার আধ্যাত্ম জীবনে পাথেয় সঞ্চয়ে তাকে ততটা মনোযোগী দেখা যায় না। এই অবিবেচনার ফল পিতা-পুত্র উভয়কেই ভোগ করতে হয়।
বাবা - মা ছেলেকে ভালবাসতে জানেন, কিন্তু কেন ভালবাসেন, তা বুঝেন না। এই অন্ধের মত ভালবাসাতেই তো সর্বনাশ হয়। অজ্ঞানের ভালোবাসায় সকল কর্তব্য বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়___ও তো ভালোবাসা নয়, ও হচ্ছে রাক্ষসী মায়া। ভালোবাসায় আমার সুখ , তাই আমি ভালোবাসি। আমার সুখ তো সংস্কার অনুযায়ী ___তা কল্যাণ, কি অকল্যাণ তা বুঝব না যতদিন পর্যন্ত নিজকে না জানব। আমি যদি মনে করি, খেয়ে দেয়েই সুখ তাহলে আমার ছেলেকেও খাইয়ে-দাইয়ে সুখী করতে চেষ্টা করব, আর বলব, আমি তাকে ভালোবাসি বলেই তার সুখ চাই। কিন্তু অজ্ঞানের ভালবাসাকেই কি সত্য লাভ বলব? তাই বলছিলাম, শুধু ভালবাসতে পারলেই হয় না; নিজেকে জেনে ভালোবাসতে পারলে, তবে সে ভালোবাসায় অপরের কল্যাণ হবে।
সন্তানের মঙ্গলকাঙ্ক্ষী হতে হলে পিতামাতাকে নিজের মঙ্গলকাঙ্ক্ষী হতে হবে। যার ভিতর যা নাই, অপরকে সে তা দিতে পারে না। আধ্যাত্মিক ভাবে নিজে প্রতিষ্ঠিত না থাকলে অপরের মাঝে তা সঞ্চারিত করা যায় না। তাই সন্তানকে যথার্থ মানুষ গড়ে তুলতে হলে পিতামাতাকে আগে খাঁটি মানুষ হতে হবে। শুধু সন্তান কামনা করলেই হবে না___ সন্তানের জন্য তপস্যা করতে হবে। যে তোমার ঘরে আসবে, সে তো তুচ্ছ কেউ নয়। ব্রহ্মবীজ অন্তরে নিয়ে তোমার কোলে যে ফুটে উঠবে, তাকে কি দিয়ে তুমি সেবা করবে, কোন পরিচর্যায় তাকে তৃপ্ত করবে? সন্তানের মাঝে নারায়ণকে প্রত্যক্ষ কর, তোমার প্রাণের সমস্ত চেষ্টা , যত্ন ,শ্রদ্ধা তাকে সমর্পণ কর,___তোমার পবিত্র, অতন্দ্রিতা সেবায় তাকে জাগিয়ে তোলো___ তবেই না___ কুলং পবিত্রং বসুধা ক্বতার্থা হবে! আর তা না করে হেলায় অশ্রদ্ধায় যদি আজ নারায়নকে ফিরিয়ে দাও, তবে তোমার সেবার ত্রুটি যে নিদারুণ অভিশাপ, তা ইহলোকে পরলোকে বজ্রের মতো তোমাকে দগ্ধ করবে। তোমার বিবেচনায় অবহেলায় একটা জীবন পশু হয়ে গেল___ এ অপরাধের শাস্তি কত গুরুতর , তা জানো কি? তোমার সেবায় এই সন্তানের ভিতরে কিনা ফুটতো, তোমাদের আকুল আকাঙ্ক্ষায় কিনা হতে পারত? অথচ এই ফুটিয়ে তুলবার সুযোগ তোমারই সবচেয়ে বেশি____কেননা ভালবাসার পরশমণি যে তোমার মাঝে রয়েছে। ভগবান জীবস্বভাবের ভালোবাসাটুকু তোমার মাঝেই ঢেলে দিয়ে আর এই একটি অফুটন্ত জীব তোমার কোলে দিয়ে যে মহাকর্তব্যের সূচনা করে দিয়েছেন, সেই কর্তব্যের পথে হে পিতর্নিবোধ নির্বোধ , হে জননী জাগৃহি।
তথ্যসূত্র: শিক্ষা - শ্রীমৎ অনির্বাণ
0 মন্তব্যসমূহ