ভারতের সুখসূর্য আজ অস্তমিত হইয়াছে। আজ সাতশত বৎসর ভারতভূমি বিদেশীয় জাতির দুর্ধর্ষ আক্রমণ সহ্য করিয়া আসিতেছে।
কত জাতি ভারতে প্রভুত্ব করিল, কত জাতি প্রভুত্ব হইতে বঞ্চিত হইল, ভারতের স্বাধীনতা আর ফিরিয়া আসিল না। এখন পরাধীনতাই ভারতের স্বাভাবিক অবস্থা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। চিররোগী যেমন পার্শ্ব-পরিবর্তন করিতেও ক্লেশ বোধ করে, সেইরূপ ভারতবর্ষ আজ কঠোর পরাধীনতার প্রাচীর অতিক্রম করিয়া এক পা উঠাইতেও যেন কষ্ট অনুভব করে। কিন্তু ভারতবর্ষের এত যে দুরবস্থা হইয়া পড়িয়াছে, তথাপি আজও হিন্দুজাতির জীবনীশক্তি বিনষ্ট হয় নাই। মুসলমানদিগের রাজত্বকালে হিন্দুদিগকে কত নির্যাতন সহ্য করিতে হইয়াছিল, মুসলমান সম্রাটগণ হিন্দুদিগকে মুসলমান করিবার জন্য কত প্রয়াস পাইয়াছিল; কত হিন্দু অকারণে মূর্তিপূজার অপরাধে ভগবৎপদ স্মরণ করিতে করিতে নিহত হইয়াছিল। সুলতান মামুদ কত দেবমূর্তি লুণ্ঠন ও শাস্ত্রাগার ভস্মীভূত করিয়াছিল। মোগল বাদসাহদিগের আমলে পাষণ্ড কালাপাহাড় হিন্দু-দিগের শ্রেষ্ঠতম তীর্থ পবিত্র পুরুষোত্তমধামে প্রবেশ করিয়া, লিখিতে বুক ফাটিয়া যায়-জগন্নাথদেবের মূর্তি দগ্ধ করিয়াছিল। আজিও সুসভ্য ইংরাজসুশাসিত দেশে, পূর্ববঙ্গের হিন্দুগণ কতকগুলা নগণ্য চাষা মুসল-মানের দ্বারা উৎপীড়িত হইয়াছে। খৃষ্টীয় গভর্ণমেন্টের বিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্য পাঠ করিয়া হিন্দুবালক খৃষ্টধর্ম শিক্ষা করিতেছে; এদিকে গভার্নমেন্টের নানাপ্রকার সাহায্যে পরিপুষ্ট খৃষ্টীয় ধর্মপ্রচারকগণ হিন্দুদিগকে খৃষ্টান করিবার জন্য কত চেষ্টা করিতেছেন। পাদ্রী মেমেরা হিন্দুর অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া সুকোমলম্বভাবা রমণীগণকে বাইবেলের উপদেশ দিতেছেন। কি নির্বদ্বিতা! যাহারা আজীবন "ঠাকুরমার গল্প” শুনিয়া শুনিয়া খৃষ্টানসংস্পর্শে আপনাকে অপবিত্র মনে করিয়া স্নান করে, বাইবেলের দু'পাতা উপদেশে তাহারা হিন্দুধর্ম পরিত্যাগ করিবে কি? যাহাহউক, এত কষ্ট, এত নির্যাতন সহ্য করিয়াও, এত বিপদের মধ্যে থাকিয়াও নানা প্রলোভনে আজিও ভারতীয় আর্যবংশ বিলুপ্ত হয় নাই। আর্যভারতে পবিত্রতম আর্যভাব এখনও সম্পূর্ণ চলিয়া যায় নাই, কখনও সম্পূর্ণ চলিয়া যাইবে বলিয়াও মনে করি না। যতদিন হিন্দুদিগের বেদ-উপনিষদ্ থাকিবে, রামায়ণ-মহাভারত থাকিবে, ততদিন এই পুণ্যভূমি ভারতবর্ষ হইতে হিন্দুত্ব কখনই চলিয়া যাইতে পারিবে না। আর্যগণের পরিবারমণ্ডলে, হিন্দুর সমাজক্ষেত্রে, আচার-ব্যবহারে, সংসারে, ধর্মসাধনার সহিত সনাতন হিন্দুধর্ম সংযোজিত বলিয়া হিন্দু-জাতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষিত হইয়া আসিতেছে।
সাতশত বৎসর বিজাতীয় সম্রাটগণের অত্যাচার-উপদ্রব সঙ্গ করিয়া একমাত্র হিন্দু ব্যতীত পৃথিবীর মধ্যে আর কোনও জাতি এইরূপ স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিতে সক্ষম হয় নাই। প্রাচীন রোমকগণ এখন কোথায়? কতকগুলি দুর্দান্ত পার্বতীয় জাতি সহসা রোমরাজ্য অধিকার করিল, ক্রমে রোমকজাতি আপনাদিগের বিশেষত্ব হারাইয়া কালসাগরে বিলীন হইয়া গেল। প্রাচীন গ্রীকজাতি, তাহাদিগের ধর্ম, তাহাদিগের আচার-ব্যবহার এখন কোথায়? প্রাচীন পারসীকগণের ধর্ম ও আচার-ব্যবহার কোথায় গেল? সে সকলই আজ প্রত্নতত্ত্বানুসন্ধায়িগণের অনুসন্ধানের বিষয় হইয়া পড়িয়াছে। ধন্য হিন্দু! ধন্য তোমাদের ধর্ম!! তোমরা তোমাদের পূর্বগৌরব সব ভুলিয়াছ, কিন্তু ধর্মের মর্যাদা ভুলিতে পার নাই, উপর্যুপরি বিজাতীয় রাজগণের অশেষ নির্যাতন সহ্য করিয়াও জাতীয় ধর্ম অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছ।
এখন দেখিতে পাই, কত হিন্দু বিজাতীয়ের জলস্পর্শ না করিয়া ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতেছেন। হিন্দুজাতির ধর্মপ্রাণতার কথা পৃথিবীর কে না জানে? "ধর্মো রক্ষতি রক্ষকং” এই মহাবাক্য কখনও মিথ্যা হয় নাই। হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করিয়াছেন, ধর্মও হিন্দুকে রক্ষা করিতেছেন। রোমক প্রভৃতি অন্যান্য জাতির পূর্বপুরুষেরা পার্থিব বিষয়লালসাতেই হৃদয় পূর্ণ করিয়া বিষয়-সাধনা করিয়াছিলেন, এইজন্য ধর্মকে লাভ করিতে পারেন নাই। ধর্মের মূল শিখিল ছিল বলিয়া সামান্য বাতাসেই তাহা বিলীন হইয়াছিল। আর হিন্দুগণ সর্বস্ব পরিত্যাগ করিয়া ধর্মের সাধনা করিয়াছিলেন, তাই হিন্দুদিগের ধর্মের ভিত্তি অত্যন্ত দৃঢ় বলিয়াই পরাধীনতার প্রবল ঝঞ্চাবাতেও অটল রহিয়াছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমানকালে একশ্রেণীর হিন্দুজাতি এমনই আত্মমর্যাদা হারাইয়া বসিয়াছেন যে, যতক্ষণ না পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ তাঁহাদিগের অমূল্য শাস্ত্রসকলকে ভাল বলিবেন, ততক্ষণ তাঁহারা জাতীয় শাস্ত্রের প্রতি চক্ষু তুলিয়া চাহিতে যেন লজ্জা বোধ করেন; সাহেবদিগের ইংরেজী-অনুবাদিত হিন্দুশাস্ত্র হইলে অন্ততঃ একবার চক্ষু বুলাইয়া থাকেন। সর্বনাশক কালের গুরুতর সংঘর্ষণে, বিজাতীয় শিক্ষার প্রচলনে আজকাল অনেকেই হিন্দুশাস্ত্র অবহেলা করিয়া মার্জিত বুদ্ধি ও উর্বর-মস্তিষ্ক-প্রসূত স্বকপোলকল্পিত মতানুসারে ধর্মসাধন করিতে প্রয়াসী। ইহা মার্জিত বুদ্ধি ও উর্বর মস্তিষ্কের ফল হউক না হউক, পাশ্চাত্য ধর্মের আমদানীতে ও বিজাতীয় সংসর্গে বিকৃত মস্তিষ্কের ফল, তাহাতে বিন্দু-মাত্র সন্দেহ নাই। এখন নূতন বাবুর জাতি নিজের ধর্ম-কর্ম জানেন না, জাতীয় রীতি-নীতি মানেন না, আর্যশাস্ত্র পাঠ করেন না, নিজের সমাজের কোন সমাচার রাখেন না। বরং আপন জাতীয় ধাতু ছাড়িয়া, প্রকৃতি ভুলিয়া, অবস্থা অবহেলা করিয়া পরের ভাবে বিভোর হইয়াছেন। এজন্য বর্তমান সময়ে নানারূপ স্বকপোলকল্পিত মতপ্রবর্তক আসুরী প্রকৃতির অনেক হিন্দু দেখা যায়। কিন্তু সুবিখ্যাত জার্মাণদেশীয় পণ্ডিত Schopenhaur (সোপেনহৌর) বলেন যে, "হিন্দুর উপনিষদসমূহ তাঁহার ইহ জীবনে শান্তিদান করিয়াছে এবং পরজীবনেও দান করিবে।” আর একজন বিখ্যাত পণ্ডিত বলিয়াছেন, "পৃথিবীর যাবতীয় ধর্মসম্প্রদায়ের ধর্মশাস্ত্র বিলুপ্ত হইয়া, হিন্দুর উপনিষদগুলি থাকিলে কোন ধর্মসম্প্রদায় ধর্মগ্রন্থের জন্য অভাব অনুভব করিবেন না।” তাই বলি, বাবুর জাতি যতই কেন কৃত্রিমতার আবরণে অঙ্গ আচ্ছাদন করুন, সাহেবেরা "কালা আদমী" ভিন্ন অন্য কিছু বলিবে না। তোমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি তাঁহাদের অবিদিত নহে; বীরের জাতি কখনও অম্লপিত্তরোগগ্রস্ত ধাতুক্ষীণ বাবু-জাতিকে সমতুল্য জ্ঞান করিবে না। একজন শিক্ষিত যুবক ইউরোপ আমেরিকাদি ভ্রমণান্তর ভারতবর্ষে প্রত্যাগমন করিয়া কোন বিশেষ অবসরে বলেন, "তুমি যে কোন দেশে যাইয়া আপনাকে হিন্দু বলিয়া পরিচয় দিবে, অমনি তাহারা সসম্ভ্রমে তোমাকে নমস্কার করিবে। এ নমস্কার তোমাকে নয়, হিন্দু বলিয়া তোমার জাতীয় ধর্মকে।”
ধর্ম রক্ষা করিবার প্রাণগত চেষ্টা থাকাতেই হিন্দুজাতির যশঃসৌরভদেশ-বিদেশে বিস্তারিত হইয়াছে ও হইতেছে। পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ ইহার জন্য হিন্দুজাতিকে মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেন। তাঁহারা শুধু হিন্দুজাতিকে প্রশংসা করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, যেসকল শাস্ত্রের কৃপায় হিন্দুজাতি ধর্ম-ভাবকে এইরূপ পরিপুষ্ট করিতে সক্ষম হইয়াছেন, সেই সকল হিন্দু-শাস্ত্রকেও তাঁহারা "কণ্ঠের ভূষণ" "শান্তিবারি” বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। পাশ্চাত্য জগতের সুবিখ্যাত অধ্যাপক মোক্ষমূলার ইংলণ্ডপ্রবাসী একজন হিন্দুকে বলিয়াছিলেন, "তোমরা আমাদিগকে ইংরাজীতে কি শিখাইবে? যদি কিছু শিখাইতে পার তাহা একমাত্র হিন্দুর উপনিষদাদি শাস্ত্রের ব্রহ্মজ্ঞান।" প্রকৃতই আর্যঋষিগণের সাধনফলে, আজ পর্যন্ত এই আর্যশাস্ত্রসকল কেবল হিন্দুজাতিকে নহে-সমুদয় সভ্য-জগৎকে।
ধর্মের সুবিমল আলোক প্রদান করিতেছে। হিন্দু সর্ববিষয়ে সকল জাতির অধম হইয়াছে, কেবলমাত্র হিন্দুজাতির ধর্মগৌরব অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে।
সূত্রঃ জ্ঞানীগুরু — নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়

0 মন্তব্যসমূহ