ধর্মের প্রয়োজনীয়তা || নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়


ধর্ম কি, ইহা বুঝিলে ধর্মসাধনার প্রয়োজনীয়তা স্বতঃই মনোমধ্যে উদিত হয়; তথাপি সে সম্বন্ধে একটু আলোচনা করা যাউক।


এই পরিদৃশ্যমান জগতের উচ্চশ্রেণীর জীব মানুষ হইতে অতি নিম্ন-শ্রেণীর জীব কীট-পতঙ্গাদি পর্যন্ত, সকলেই সুখের জন্ম অহোরাত্র লালায়িত-সুখের জন্য প্রতিক্ষণ ব্যস্ত। তাহাদের স্বভাব, গতি ও ব্যবহার দেখিলে বুঝিতে পারা যায়, সুখের আশা সকলেই করে। কিন্তু সুখী কে? অনুসন্ধান করিলে দেখিবে, পৃথিবীর একচ্ছত্রাধিপতি সম্রাট্ হইতে কুটীরবাসী ভিখারী পর্যন্ত, সকলেই আশা-আকাঙ্ক্ষার তীব্রদংশনে নিয়ত অস্থির। ধন-জন বল, রূপৈশ্বর্য বল, খ্যাতি-প্রতিপত্তি বল, কিছুতেই মানুষ তৃপ্ত হইতে পারে না। আকাঙ্ক্ষা-রাক্ষসীর হস্ত হইতে কাহারও নিস্তার নাই। চন্দ্রিকাশালিনী বসন্তযামিনীর মধ্যভাগে যুথিকা-শয্যায় শয়ন করিয়াও দিল্লীর প্রবলপ্রতাপ সম্রাটগণ সুখী হইতে পারেন নাই। সংসারে কাহারও আশা পূরে না-সাধ মিটে না। কেহ এক বিষয়ে সুখী হইলেও অন্যান্য পাঁচ বিষয়ে নিরন্তর মনঃকষ্টে কাল যাপন করিতেছে। তবে সুখ কোথায়? সুখী কে?

সুখ অর্থে [সু-উত্তম+খ (জ্ঞানের) ইন্দ্রিয়] ইন্দ্রিয়-শক্তির স্বভাব-নিয়মিত স্ফূর্তি, তৃপ্তি ও সামঞ্জস্য। ইন্দ্রিয় আত্মার শক্তিবিশেষ। তাহা হইলেই বলা যাইতে পারে যে, আত্মশক্তি জ্ঞানের স্ফূর্তি, তৃপ্তি ও সামঞ্জস্যই সুখ। ধর্ম সেই সুখের উপায়, ধর্মদ্বারাই ইন্দ্রিয়-শক্তির সম্যক্ স্ফূর্তি, তৃপ্তি ও সামঞ্জস্য সাধিত হয়।


সুখং বাঞ্ছতি সর্বো হি তচ্চ ধর্মসমুদ্ভবম্।

তস্মাদ্ধর্মঃ সদা কার্যঃ সর্ববর্ণৈ: প্রযত্বতঃ ।

—দক্ষসংহিতা, ৩৩২২

সকলেই সুখের বাঞ্ছা করিয়া থাকে, কিন্তু সুখ ধর্ম হইতে সমুদ্ভুত হয়; অতএব সকলেই সর্বদা সযত্নে ধর্মাচরণ করিবে। ধর্মাচরণে ইন্দ্রিয়শক্তির সম্যক্ স্ফূর্তি, তৃপ্তি ও সামঞ্জস্য সাধন করিয়া তখন সর্ববিধ জগতের (বাহ্য, আন্তর, বৌদ্ধ ও অধ্যাত্ম) যথার্থ তত্ত্ব আত্মায় উপলব্ধি করিলে সুখ লাভ হয়। সে সুখ স্থায়ী, তাহাতে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মৃদু মধুর লহরীলীলা আছে, লেলিহান আকাঙ্ক্ষার লক্ লক্ জিহ্বার প্রসার ও অনলময়ী ঝটিকা নাই।

আরও এক কথা, সংসারে সর্বসুখে সুখী হইলেও, সে সুখ চিরস্থায়ী নহে। কেননা দেহপাত হইলে পরলোকের পথে ধন-জন বল, স্ত্রী-পুত্র বন্ধু-বান্ধব বল, কেহই সাথের সাথী হইবে না, তখন একমাত্র ধর্ম সঙ্গে যাইবে।

এক এব সুদ্ধদ্ধর্মো নিধনেহপ্যনুযাতি যঃ।

এতাবতা স্পষ্টই জানা গেল যে, জীব স্বাধীন, ধর্মপ্রবৃত্তি তাহাদের স্বাধীন বৃত্তি, অবিস্থা বা মায়া তাহাকে মোহগর্তে নিপাতিত করিতেছে। অতএব মনুষ্যের কর্তব্য যে, যাহাতে মায়ার হাত হইতে রক্ষা পাইয়া আত্মোন্নতি হয়-আত্মপ্রসাদ লাভ হয়-কামনাবাসনার খাদ দূরীভূত হয় তাহাই করা। আত্মা সুখ-দুঃখ চাহেন না, আত্মোন্নতিই দুর্লভমনুষ্যজন্মের লক্ষ্য-আত্মোন্নতির মূল কারণ ধর্ম, একথা সকল দেশের জ্ঞানিগণের অনুমোদিত। ঐ দেখ, পাশ্চাত্য ধর্মগুরু বলিতেছেন-

Not enjoyment and not sorrow
Is our destined end or way,
But to act, that each tomorrow
May find further than to-day.

শুধু আত্মোন্নতি বলি কেন? অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতির মূলেও ধর্ম নিহিত। অতএব ধর্মের মত বন্ধু আর কে আছে? ইহ-লোকের কথা ছাড়িয়া দিলেও, সেই পরলোকে-সেই অজানা-অপরিচিত দেশে, সেই পাপ-পুণ্য-বাসনা-শান্তির দেশে, সেই নরক-স্বর্গের সাধনার দেশে যে অনুগামী হয়, তাহার মত আদরের যত্নের স্নেহের বন্ধু আর কে আছে? ধর্ম-সাধনার প্রয়োজনীয়তা বোধ হয় সকলেই বুঝিয়াছেন। ধর্মের স্নেহবাহুর মধ্যে-সুরভি-সুবাসের মধ্যে আত্মাকে সুখে রাখিবার উদ্দেশ্যই ধর্মসাধনার প্রয়োজন।

আর একটি মহতী কথা, আত্মা পরমাত্মার অংশ (দ্বৈতমতে পার্ষদ বা দাস), সুতরাং ব্রহ্মানন্দ বা পূর্ণ সুখ তিনি ভোগ করিয়াছেন, সে আস্বাদ জানেন। জগতের জীব সেই সুখের সন্ধানে ব্যস্ত। জীব অবিদ্যার বন্ধনে আত্মবিশ্বত, কিছুই জানে না-কিছুই বুঝে না, তবুও সুখের জন্য লালায়িত, জীবমাত্রেই সুখস্পৃহার অধীন। ব্রহ্মানন্দের অনুভূতিতে জীব ছুটিতেছে। সুখের আশাতেই দাতা দান করিতেছে, গ্রহীতা হাত পাতিতেছে, সুখের কামনায় রাজরাজেশ্বরী মাথায় মুকুট পরিতেছে, কাঙ্গালিনী তৃণগুচ্ছে কুটীর সাজাইতেছে। সুখের পিপাসার দুর্নিবার জ্বালায় সখের ইয়ার 'ঢাল ঢাল আরও ঢাল' বলিয়া বোতলস্থ দ্রব্য-বহ্নির দিকে দৃষ্টিপাত করিতেছে। সুখের জন্যই চোর চুরি করিতেছে, কেহ রূপ-রস টাকাকড়ি কামনা করিতেছে, কেহ অযথা ইন্দ্রিয় পরিচালনা করিতেছে। সর্বজনহিতৈষী সাধু সুখতৃপ্তিরই অজ্ঞাত অনুশাসনে, দীনদুঃখীর দুঃখমোচনচিত্তায় ডুবিয়া রহিয়াছেন। সুখ-তৃপ্তি-লালসাতেই রাজাধিরাজ ধনৈশ্বর্য পরিত্যাগ করিয়া ভিখারী সাজিতেছেন, আব দরিদ্র দশটি টাকার জন্য অপরের প্রাণ নষ্ট করিতেছে। তৃষ্ণার্ত মৃগ যেমন মরীচিকায় জলভ্রমে ধাবিত হয়, সুখের আভাস পাইলেই জীব তদ্রূপ ধাবিত হইতেছে। কিন্তু সংসারে সবাই অতৃপ্ত, কাহারও সুখের আশার নিবৃত্তি হইতেছে না। হইবে কেন? সংসারে সকল সুখই অংশ মাত্র, জীব পূর্ণ সুখের কাঙাল। ব্রহ্মানন্দের তুলনায় রাজৈশ্বর্য তুচ্ছ, তাই রাজরাজেশ্বর মণিময় ময়ূর সিংহাসনে বসিয়াও তৃপ্তিলাভ করিতে পারেন নাই। কেবল একমাত্র ধর্মাচরণে সে সুখ সম্ভোগ করিতে পারা যায় বলিয়াই সকলে ধর্মসাধনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন।


© জ্ঞানীগুরু — নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়









একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ