আত্মতত্ত্ব || শ্রীশ্রী ঠাকুর নিগমানন্দ পরমহংসদেব








কোন সময়ে মিথিলাধিপতি রাজর্ষি জনক তদীয় গুরু মহামুনিপ্রবর অষ্টাবক্রকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন;-


কথং জ্ঞানমবাপ্নোতি কথং মুক্তির্ভবিষ্যতি।

বৈরাগ্যঞ্চ কথং প্রাপ্যমেতৎ ত্বং ক্রহি মে প্রভো।


অর্থাৎ কিরূপে প্রকৃত জ্ঞানলাভ হয়? কিরূপেই বা মোক্ষপ্রাপ্ত হওয়া যায় এবং কি উপায়েই বা হৃদয়ক্ষেত্রে বৈরাগ্যের সঞ্চার হইতে পারে? কৃপা করিয়া তাহা আমার নিকট বর্ণনা করুন।


প্রিয় শিষ্য জনকের প্রশ্ন শুনিয়া আনন্দিতচিত্তে আত্মতত্ত্বজ্ঞান মহর্ষি অষ্টাবক্র রাজাকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন,-


মুক্তিমিচ্ছসি চেৎ তাত বিষয়ান্ বিষবত্ত্যজ।

ক্ষমার্জবদয়াতোষসত্যং পীযূষবদ্ভজ।।


হে তাত! মুক্তির ইচ্ছা হইলে বিসদৃশ বিষয়-বাসনা ত্যাগ করা বিধেয় এবং ক্ষমা, সরলতা, দয়া, সন্তোষ ও সত্য এ সকলকে অমৃততুল্য বিবেচনায় আশ্রয় করিয়া শ্রবণ মনন নিদিধ্যাসন সহকারে নিয়ত আত্মতত্ত্ব বিচার কর।


তুমি মনুষ্য নহ, দেবতা নহ, যক্ষও নহ; তুমি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বা শূদ্রও নহ; তুমি ব্রহ্মচারী, কি গৃহী, কি বানপ্রস্থী, কি ভিক্ষু কিছুই নহ; তুমি সর্ব্বান্তর্যামী জ্ঞানময় আত্মা।


যেরূপ ভাস্কর সমুদিত হইলে লোকসকল স্ব স্ব বিষয়ের ব্যবহার করে এবং সূর্যোদয়ই যেমন লৌকিক ব্যবহারের কারণ; তদ্রূপ যিনি মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত এই অন্তরিন্দ্রিয়চতুষ্টয় এবং নেত্র, কর্ণ, নাসিকা, রসনা ও ত্বক এই জ্ঞানেন্দ্রিয়পঞ্চকের স্ব স্ব বিষয়ে প্রবৃত্তির কারণ, যিনি সর্ব্ববিধ উপাধিশূন্য, আকাশবৎ সর্ব্বব্যাপী, যিনি জগতের অদ্ভুত সৃষ্টিকার্য্য দ্বারা প্রত্যক্ষীভূত, তুমি সেই নিত্য জ্ঞানময় আত্মা।


যেরূপ উষ্ণতা বহ্নিকে আশ্রয় করিয়া থাকে, তদ্রূপ ইন্দ্রিয়াদি জড়বস্তুসমূহ যে অদ্বিতীয়, নিশ্চল, নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মাকে আশ্রয় করিয়া স্ব স্ব কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়, তোমাকে সেই নিত্যজ্ঞানময় আত্মা বলিয়া জানিবে।


যেরূপ দর্পণাদি স্বচ্ছবস্তুতে মুখের প্রতিবিম্ব লক্ষিত হয়, বস্তুতঃ সেই প্রতিবিম্ব মুখ হইতে ভিন্ন নহে, সেইরূপ বুদ্ধিতে আত্মার প্রতিবিম্বস্বরূপ যে জীব, তাহা আত্মা হইতে পৃথক নহে; তোমাকে সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা বলিয়া জানিও।


যে প্রকার দর্পণাদির অভাবে প্রতিবিম্বেরও অভাব হইয়া থাকে, তখন কেবল মুখমাত্র অবশিষ্ট থাকে, সেই প্রকার বুদ্ধির অভাবে প্রতিবিম্বশূন্য অদ্বিতীয় আত্মার প্রতীতি হয়, তোমাকে সেই নিত্যজ্ঞানময় আত্মা বলিয়া জানিবে।


যেরূপ জবাকুসুমাদি উপাধির নিকট অতি স্বচ্ছ স্ফটিকাদি বস্তুর বৈলক্ষণ্য দৃষ্ট হয় এবং যদ্রূপ একমাত্র চন্দ্র চঞ্চল সলিলে নানাবিধ বিলক্ষিত হয়, তদ্রূপ সেই সর্ব্বময় সর্ব্বান্তর্যামী পরমব্রহ্ম এক অর্থাৎ অদ্বিতীয় হইয়াও নানা প্রাণীর নানা বুদ্ধিতে নানাপ্রকারে উপলব্ধ হইতেছেন। তুমি সেই অদ্বিতীয় জ্ঞানস্বরূপ আত্মা।


আত্মা পৃথিবী নহে, জল নহে, অগ্নি নহে, বায়ু নহে, আকাশ নহে, তোমার এই দেহও আত্মা নহে; এই সকলের সাক্ষিস্বরূপ যে চিন্ময়, তাঁহাকেই আত্মা বলিয়া জানিবে। এ প্রকার অবগত হইতে পারিলেই মোক্ষলাভ হয়। তুমি যদি দেহাদি হইতে পৃথক্ বিবেচনা করিয়া চিন্ময়ে অবস্থান করিতে পার, তবে নিশ্চয়ই শীঘ্র সুখী, শান্ত ও বন্ধনমুক্ত হইবে।


তুমি বিপ্র দ্বিজ ও শূদ্র অর্থাৎ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র নহ, ব্রহ্মচর্য্য প্রভৃতি কোন আশ্রমী নহ, তুমি ইন্দ্রিয়সমূহের অগোচর, অসঙ্গ, নিরাকার, নির্বিকার, নিরালম্ব ও বিশ্বের সাক্ষিস্বরূপ। হে তাত! এবম্প্রকার জ্ঞান হইলে সুখী হইবে।


হে বিভো! তুমি ধৰ্ম্ম, অধৰ্ম্ম, সুখ, দুঃখ এ সকল চিত্তধর্মে অলিপ্ত অর্থাৎ কিছুতেই তুমি লিপ্ত নহ। তুমি সর্ব্বদাই মুক্তস্বরূপ, তুমি এক অদ্বিতীয়; তুমি যে নিজেকে সর্ব্বব্যাপী সর্ব্বান্তর্যামী সর্ব্বসাক্ষিস্বরূপ বিবেচনা না করিয়া অন্যবিধ চিন্তা করিতেছ, তাহা তোমার পক্ষে বন্ধন।


আমি কর্তা, আমি ভোক্তা, এই প্রকার অহঙ্কারাভিমানরূপ মহাকালসর্প কর্তৃক তুমি দংশিত হইয়াছ, সুতরাং "আমি কর্তা বা আমি ভোক্তন নই” এরূপ দৃঢ় বিশ্বাসামৃত পান করতঃ এবং "আমি একাকী বিশুদ্ধ জ্ঞানস্বরূপ” এরূপ নিশ্চয়বহ্নি দ্বারা অজ্ঞানরূপ বন-জঙ্গলসকল ভস্মীভূত করিয়া বীতশোক ও সুখী হও।


রজ্জুতে সর্পভয়ের ন্যায় যাঁহাতে অখিল বিশ্ব কল্পিত হয়, তাঁহাকে আনন্দময় পরমানন্দস্বরূপ জ্ঞান করতঃ সুখী হও। যিনি মুক্তি-অভিমানী অর্থাৎ মুক্তিলাভের ইচ্ছা যাঁহার আছে, তাঁহাকে মুক্ত, আর যিনি বন্ধাভিমানী অর্থাৎ সংসারে সংলিপ্ত থাকিতে যাঁহার মানস আছে, তাঁহাকে বদ্ধ বলে, এই প্রকার জনশ্রুতি আছে। ফলতঃ যাঁহার যেরূপ বুদ্ধি, তাঁহার তদ্রূপই সিদ্ধি হয়। "যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী।” বাস্তবিক আত্মা সমুদয়েরই সাক্ষিস্বরূপ, বিভু অর্থাৎ পূর্ণ অথচ সর্ব্বব্যাপী, এক, অদ্বিতীয়, মুক্ত অর্থাৎ নির্লিপ্ত, সর্ব্বৈশ্বর্য্যযুক্ত, অক্রিয়,. অসঙ্গ, স্পৃহাশূন্য ও শান্ত; ভ্রমবশতঃ তাঁহাকে সংসারী বলিয়া আমরা বোধ করি। তুমি আত্মাকে কূটস্থ জ্ঞানস্বরূপ চিন্ময় বলিয়া জানিবে। তুমি ভ্রম ত্যাগ করিয়া "আমার শরীরাদি” বাহ্য পদার্থবিষয়ক চিন্তা ও "অহং সুখী, অহং দুঃখী" ইত্যাদি পদার্থবিষয়ক চিন্তা পরিত্যাগ কর। হে তাত! দেহাভিমানরূপ পাশদ্বারা চিরবদ্ধ হইয়াছ; "আমিই জ্ঞানস্বরূপ” এরূপ জ্ঞানখড়া দ্বারা ঐ পাশ ছেদন করতঃ সুখী হও।


তুমি নিঃসঙ্গ, নিরাশ্রয়, আত্মপ্রকাশ, নিরঞ্জন; তুমি যে সমাধির জন্য ইচ্ছা করিতেছ, ইহাই তোমার বন্ধন। তুমি নিরপেক্ষ, নির্ভয়, শুদ্ধবুদ্ধস্বরূপ, অতএব নীচেচ্ছা, নীচ চিন্তা পরিত্যাগ কর। তুমি সদাশয়, অগাধবুদ্ধি, লোভ ও ক্ষোভবিবর্জিত এবং চিন্মাত্রবাসনাশীল হও, বিশ্বময় সমুদয় সাকার পদার্থ মিথ্যা এবং নিরাকার বস্তুই সত্য এ প্রকার উপদেশ দ্বারা পুনর্জন্ম ধ্বংস হয় অর্থাৎ এরূপ তত্ত্বোপদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তির শরীর ধারণ করিতে হয় না। 'তস্য পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।' আমার স্বীয় রূপ প্রকাশমান হইতেছে, আমি নিজরূপ হইতে অতিরিক্ত রূপ ধারণ করি না; সুতরাং যখন জগৎ পরিদৃশ্যমান, তখন আমিও যে প্রকাশমান, তাহাতে আর সংশয় কি? যেমন শুক্তিতে রৌপ্য, রজ্জুতে ভুজঙ্গ, সূর্যরশ্মিতে জলভ্রম জন্মে, সেইরূপ অজ্ঞানহেতুই আমাকে অর্থাৎ আত্মাকে জগৎ জ্ঞান করিয়া ভ্রমমোহিত হইয়া থাকে।


যেরূপ কুম্ভ মৃত্তিকা হইতে ভিন্ন নহে, পরিণামে মৃত্তিকায় মিশিয়া যায়, তরঙ্গ জল হইতে পৃথক্ নহে, পরিণামে জল মাত্র থাকে এবং কটকাদি অলঙ্কার স্বর্ণ হইতে ভিন্ন নহে, অবশেষে স্বর্ণই থাকে, সেইরূপ এই জগৎ আমা হইতে ভিন্ন নহে, পরিণামে আমাতেই লয় পাইবে, সন্দেহ নাই। আদর্শমধ্যস্থিত পদার্থের প্রকৃতি যেমন অভ্যন্তরে ও বাহিরে দুই দিকেই প্রতিবিম্বিত হয়, সেইরূপ পরমেশ্বরও দেহমুকুরে প্রতিবিম্বিত হইয়া মধ্যে ও বাহিরে নিরন্তর বিরাজ করিতেছেন। সর্ব্বগত আকাশ যেমন ঘটের অভ্যন্তরে ও বহির্ভাবে বর্তমান থাকে, সেইরূপ পরব্রহ্মাও নিরন্তর নিখিল ভূতের অন্তরে ও বাহিরে অধিষ্ঠিত আছেন। অধুনা আমি শরীর ও বিশ্ব পরিত্যাগ করিয়া কৌশল অর্থাৎ যোগদ্বারা পরমাত্মার দর্শন লাভ করিতেছি। জল-তরঙ্গ, ফেন, বুদ্বুদ ইত্যাদি যেমন জল হইতে পৃথক্ নহে, সূত্র যেমন বস্ত্রের প্রধান কারণ, তদ্রূপ আত্মা জগতের একমাত্র শ্রেষ্ঠ হেতু, সন্দেহ নাই। যেরূপ ইক্ষুরসে শর্করা ও শর্করাতে ইক্ষুরসের অংশ পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে, সেইরূপ আত্মাতে বিশ্ব ও বিশ্বে আত্মা পরস্পর সর্ব্বদাই বিরাজমান।


অহো। আমি অবিনাশী। ব্রহ্ম হইতে স্তম্ব পর্য্যন্ত জগতের সমুদয় পদার্থ ধ্বংস হইলেও আমি বর্তমান থাকিব, সুতরাং আমাকেই আমি নমস্কার করি।


মুনিপ্রবর কহিলেন, আত্মাকে অবিনাশী ও অদ্বিতীয় এবং সৎ চিৎ একং ব্রহ্মহ্ম অর্থাৎ সচ্চিদানন্দম্ বলিয়া যখন পরিজ্ঞাত হইয়াছ, তখন তুমি যথার্থই আত্মজ্ঞ ও ধীর, অতএব অর্থোপার্জনে তোমার প্রবল আশা কেন?


অহো! শুক্তিজ্ঞানের অভাব হইলে যেরূপ রৌপ্যভ্রম জন্মিয়া থাকে, সেইরূপ আত্মজ্ঞানের অভাবহেতু জীবগণের বিষয়ভ্রম জন্মে। যেরূপ মহাসাগরে তরঙ্গনিকর সমুদ্ভূত হয়, সেইরূপ একমাত্র চিৎস্বরূপ যে "আমি", আমা হইতে জগৎ কল্পিত; অর্থাৎ মহাসাগর যেমন তরঙ্গের এক প্রধান কারণ, সেইরূপ একাত্মাই বিশ্বসংসারের একমাত্র শ্রেষ্ঠ কারণ। তুমি এ সকল বিষয় বিদিত থাকিয়াও কেন দুঃখিত মনে ইতস্ততঃ ধাবিত হইতেছ?


তুমি এই সংসারে সঙ্গরহিত ও বিশুদ্ধ জ্ঞানস্বরূপ, অতএব তোমার ত্যাগ ইচ্ছা সম্ভবে না। যাহা হউক, অধুনা এরূপ জ্ঞান লাভ করতঃ পাঞ্চভৌতিক দেহের বিনাশ-সাধনপূর্ব্বক পরব্রহ্ম পরমপুরুষে লয় প্রাপ্ত হও। জলবুদ্বুদ যেমন জল হইতে উৎপন্ন হইয়া পুনরায় সেই জলেই লয় হয়, সেইরূপ এই বিশ্বপ্রপঞ্চ তোমা হইতে অর্থাৎ আত্মা হইতে সমুৎপন্ন হইয়া পরিণামে তোমাতেই অর্থাৎ আত্মাতেই লয় পাইবে।


যেমন অগ্নি হইতে স্ফুলিঙ্গ সমুদ্ভূত হইয়া আবার সেই অগ্নিতেই লীন হয়, তেমনি আত্মা হইতে জগৎ উৎপন্ন হইয়া আবার সেই আত্মাতেই লয় হইয়া থাকে; এই সমস্ত পর্যালোচনা করিয়া, জ্ঞানলাভ করতঃ লয়প্রাপ্ত হও। তোমার সুখ-দুঃখ সমান, আশা-নিরাশা সমান ও জীবন-মৃত্যু সমান। তুমি আমাকে পূর্ণজ্ঞানময় বিবেচনা করিয়া লয়প্রাপ্ত হও।



★সূত্রঃ আত্মতত্ত্ব — তত্ত্বমালা/ ঠাকুর নিগমানন্দ পরমহংসদেব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ